দীর্ঘ সময়ে গুম, হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনার শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
রোববার (২৩ আগস্ট) মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের অবদান রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। গুমের শিকার হয়ে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তি, হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষ, বিচারবহির্ভূত হত্যার ভুক্তভোগী, নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারানো বা পঙ্গুত্ববরণকারী এবং মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করে নিঃস্ব হয়ে পড়া ব্যক্তিদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রাষ্ট্র যে স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিয়েছে, অতীতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। এ কারণেই নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে একই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ঘটনা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
সভায় মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গে মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ভোটাধিকার হরণের মতো ঘটনায় এসব মৌলিক আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিভিন্নভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। কেউ জীবন হারিয়েছেন, কেউ গুম হয়েছেন, আবার কেউ নির্যাতন ও মামলার কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। তাদের জন্য রাষ্ট্র কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে, সেই দায়িত্ব থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন অধিদপ্তর গঠনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং দেশের সংবিধানকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সভায় আলোচিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের অধিকার, সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
এ ছাড়া ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর প্রথম তফসিল বা Allocation of Business সংশোধন করে এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও নীতিগত আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার পথও সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্র: প্রদত্ত সংবাদ প্রতিবেদন।