দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন ও বিশ্বায়নকে এগিয়ে নিয়েছে আধুনিকায়নের পাশ্চাত্য পথ। এটি মানবসভ্যতায় ইতিবাচক অবদান রেখেছে এবং আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হিসেবেও কাজ করেছে। কিন্তু এর প্রভাবে অনেকের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আধুনিকায়নের জন্য শুধু একটি পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট পথই অনুসরণ করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে, আধুনিকায়নের কোনো সর্বজনীন ছাঁচ কখনোই ছিল না। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিজ দেশের বাস্তবতার ভিত্তিতে ‘জনগণই প্রথম’ – এই মূল মূল্যবোধকে বিকশিত করেছে এবং ‘আধুনিকায়ন মানেই পাশ্চাত্যায়ন’-এই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছে।
চীনের হাজার বছরের শাসন-সংস্কৃতিতে প্রোথিত ‘জনগণই প্রথম’-এই আধুনিক মূল্যবোধ ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনে এনেছে গভীর পরিবর্তন। উন্নত দেশগুলোর যে অর্জনে শত শত বছর লেগেছে, চীন তা কয়েক দশকেই অর্জন করেছে। এমনকি এখন সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা।
উন্নয়নে গতি সঞ্চার করা এই ধারণার সাংস্কৃতিক শিকড় খুঁজে পাওয়া যাবে হাজার বছর ধরে চলে আসা প্রাচীন চীনা প্রবাদ ও চিন্তাধারায়। ১০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার পথে দেখা গেছে এর বাস্তব প্রতিফলন। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই এর বৈশ্বিক তাৎপর্য স্বীকার করেছে।
‘জনগণই প্রথম’ ধারণার গঠন:‘জনগণই প্রথম’ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের একটি মূল ধারণা। এটি মার্ক্সবাদের জনগণভিত্তিক চিন্তাধারার সমকালীন উত্তরাধিকার ও সৃজনশীল বিকাশের প্রতিনিধিত্ব করে।প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই জনগণের সেবাকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি।
নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্রের ওপর সি চিন পিংয়ের চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ‘জনগণই প্রথম’ কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক ব্যবস্থা, যেখানে তাত্ত্বিক উৎস, সাংস্কৃতিক শিকড়, বাস্তব যুক্তি ও বৈশ্বিক মূল্যবোধ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
২০১২ সালে অনুষ্ঠিত সিপিসির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে, সি চিন পিংকে কেন্দ্র করে সিপিসির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ‘আন্তরিকভাবে জনগণের সেবা করা’র মৌলিক নীতিকে সংস্কার ও উন্নয়ন, জনগণের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা এবং সামাজিক শাসনের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে একটি জনকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন।
‘জনগণই প্রথম’ ধারণার সাংস্কৃতিক শিকড়:‘জনগণই প্রথম’ ধারণাটি চীনের ঐতিহ্যবাহী জনমুখী চিন্তাধারার একটি সৃজনশীল রূপান্তর। হাজার বছর আগে ‘শাংশু’ গ্রন্থে বলা হয়েছিল, ‘জনগণই রাষ্ট্রের ভিত্তি; ভিত্তি শক্ত হলে রাষ্ট্র শান্তিতে থাকে।’প্রাচীন চীনা দার্শনিক মেংচি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘জনগণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্র তার পরে, শাসক সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ।’
পরবর্তী প্রজন্মগুলো যেভাবে শাসন-জ্ঞান অর্জন করেছে সেটাকে বোঝানো যায় এই প্রবাদ দিয়ে—‘জল যেমন নৌকাকে ভাসাতে পারে, তেমনি ডুবিয়েও দিতে পারে’। অর্থাৎ সরকারের উত্থান সবসময় জনগণের সমর্থনের ওপরই নির্ভর করে।
তবে ঐতিহ্যবাহী জনমুখী চিন্তাধারা মূলত শাসকের নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখার জন্য জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি শাসন কৌশল ছিল। সেখানে জনগণ শাসনের বিষয় না হয়ে সবসময় শাসনের বস্তু ছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনগণই প্রথম’ ধারণা এই ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
এই ধারণা জনমুখী চিন্তাধারা থেকে জনগণকে গুরুত্ব দেওয়ার মূল ভাবনাটিকে গ্রহণ করেছে এবং তা মার্ক্সবাদের ‘জনগণই কর্তা’—এই অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে যুক্তও করেছে। এর ফলে ‘শাসনের বস্তু’ থেকে জনগণ ‘দেশের মালিক’-এ পরিণত হয়েছে।
হাজার বছর ধরে চলে আসা জনমুখী প্রজ্ঞা এই যুগে পেয়েছে নতুন প্রাণশক্তি। ‘দেশই জনগণ, জনগণই দেশ’—সি চিন পিংয়ের উত্থাপিত এই নতুন যুগের রাজনৈতিক ঘোষণা ‘জনগণই প্রথম’ নীতির মূল্যবোধের গভীর অনুসন্ধানকে তুলে ধরে।
‘জনগণই প্রথম’ ধারণার বাস্তবায়ন:নতুন যুগের চীনের শাসনব্যবস্থায় ‘জনগণই প্রথম’ একটি মৌলিক মূল্যবোধ। জনগণের জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় এই নীতির প্রতিফলন দেখা যায় প্রায় ১০ কোটি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার ঐতিহাসিক সাফল্যে। এর মাধ্যমেই হাজার বছর ধরে চীনকে জর্জরিত করে আসা চরম দারিদ্র্যের সমস্যার সমাধান হয়েছে। সেইসঙ্গে ১৪০ কোটি মানুষের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসাব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে ‘জীবন প্রথম’ নীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য সংকটের সময় মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকেই দেওয়া হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সীমাবদ্ধতা যা-ই থাকুক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই এই নীতির লক্ষ্য।
সংস্কারের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ মানুষের স্বার্থে’ কাজ করবে। সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবে মানুষের কল্যাণে কাজ করছে কি না, মূল্যায়ন হবে সেটার ভিত্তিতেই।
এই নীতি জনগণের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেয় এবং নিশ্চিত করে যে সংস্কারের সুফল যেন সমাজের সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
ক্ষমতা পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘জনগণের কল্যাণ’কে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সাফল্য এবং ‘জনগণের সন্তুষ্টি’কে সর্বোচ্চ মূল্যায়নের মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, যাতে ক্ষমতা সবসময় জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়।
‘জনগণই প্রথম’ ধারণার বৈশ্বিক তাৎপর্য:‘জনগণই প্রথম’ ধারণার বাস্তব তাৎপর্য অনেক আগেই চীনের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক শাসনেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে ধারণাটি।
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আধুনিকায়নের পথ গড়ে উঠেছে পুঁজির যুক্তিকে কেন্দ্র করে। এর ফলে সম্পদের বৈষম্য ও সামাজিক বিভাজন ক্রমে বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ব্যবধানও বেড়েছে। এর ফলে জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চীনের ‘জনগণই প্রথম’ নীতি প্রমাণ করেছে, কোনো দেশ পুঁজির মুনাফা ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মৌলিক স্বার্থকে স্থান দিতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষতা ও ন্যায্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি নিজস্ব আধুনিকায়নের পথ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে ‘পুঁজির অগ্রাধিকার’-এর ফাঁদ থেকেও বেরিয়ে আসা সম্ভব।
ধারণাটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শাসন-সমাধানও তুলে ধরেছে। এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার শাসনকে ‘সংখ্যালঘুদের জন্য ফাঁকা বুলি’ থেকে ‘উন্নয়নের মাধ্যমে মানবাধিকারের প্রসার’-এর বাস্তবমুখী পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। চীনা মূল্যবোধের মাধ্যমে আরও ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসংগত বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও নতুন গতি এনেছে এ ধারণা।
সূত্র:রুবি-ফয়সল-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ ।