জাতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলন-এর উদ্যোগে শনিবার (২০ জুন) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের সেমিনার কক্ষে “২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ” শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সধারণ সম্পাদক কামাল বায়জিদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্টীর চলচ্চিত্র, চারুকলা ও গবেষণা বিভাগের সম্পাদক সজীব তানভীর, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক নারগিস আক্তার, চলচ্চিত্র প্রযোজক শাহরিন সুমি এবং পলিসি থিংক এন্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক। মুক্ত আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন জাতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনের সংগঠক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরউল্লাহ ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
উদীচির শিল্পগোষ্ঠী চলচ্চিত্র সম্পাদক সজিব তানভীর প্রশ্ন তোলেন, এই ৮০০ কোটি টাকার তহবিল কোন মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ হয়েছে কি না। তিনি বলেন, যেহেতু এটি জনগণের অর্থ, তাই এর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজিদ বলেন, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি একটি নতুন ধারণা। তাই কোন খাতকে ক্রিয়েটিভ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং কী মানদণ্ডে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
চলচ্চিত্র প্রযোজক শাহরিন আক্তার সুমি বলেন, বরাদ্দের অর্থ যেন যথাযথভাবে ব্যবহার হয় এবং এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও সহায়ক নীতি প্রণয়ন করা হয়।
চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক নারগিস আক্তার প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, এত বড় আকারের তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান বলেন, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রকে জাতির মানসিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক চর্চা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মোহাম্মদ নূরউল্লাহ তার লিখিত প্রবন্ধে বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা একটি যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সৃজনশীল শিল্প, চলচ্চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল, অ্যানিমেশন, গেমিং, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সাংস্কৃতিক শিল্পের বিকাশে এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রবন্ধে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য ৩০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ সরকারি বরাদ্দ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিলসহ মোট ৮০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা দেশের সৃজনশীল তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে এ তহবিলের বণ্টন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রবন্ধে তিনি উপস্থাপনের সময় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হলেও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য মাত্র ৮২৬ কোটি টাকা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জন্য ১,১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতি খাতের জন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানানো হলেও এবারের বাজেটেও সে দাবি প্রতিফলিত হয়নি।
প্রবন্ধে নূরউল্লাহ বলেন, সংস্কৃতি ও তথ্য খাতের বরাদ্দের বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে খরচ হয়, ফলে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, তৃণমূলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র উৎসব এবং সৃজনশীল শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে ক্রমবর্ধমান প্রগতিবিরোধী ও অসহিষ্ণু সামাজিক প্রবণতা মোকাবিলায় চলচ্চিত্র, শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। অথচ এ বিষয়ে জাতীয় বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা বিশেষ বরাদ্দ প্রতিফলিত হয়নি।
মুক্ত আলোচনা থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ উত্থাপন করা হয়:
১. চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ নিশ্চিত করা হোক।
২. ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ৫০০ কোটি টাকা করা এবং একটি স্থায়ী ‘জাতীয় সৃজনশীল শিল্প কমিশন’ গঠন করা হোক।
৩. বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল পুনরুজ্জীবন এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন করা হোক।
৪. সিনেমা হলের আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হোক।
৫. সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘সংস্কৃতি সুরক্ষা টাস্কফোর্স’ গঠন এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ প্রদান করা হোক।
সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবিতে উপস্থিত সকলে একমত হন।