বিষন্নতা ও আপনি
-ডাঃ মেহেরুল হুদা
কথায় আছে – মৃত্যুই স্বাভাবিক বেঁচে থাকা অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিকতার কারণ দুশ্চিন্তা। আর এই দুশ্চিন্তা হতে পারে নানা উৎস থেকে। কখনো অতি নগন্য কিছু কখনোবা বিশাল কিছু। উৎস হতে পারে কখনো বাস্তব কখনো বা অবাস্তব। যেমন কোনো এক অলস দুপুরে টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টির শব্দ , স্বামী কাজে , একলা বাসায় মা তার তিন বছরের বাচ্চাকে পাশে শুয়ে থেকে ঘুম পাড়াচ্ছেন আর ক্ষনে ক্ষনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন এই ভেবে যে উনি যদি না থাকেন তাহলে বাচ্চাটাকে কে দেখে রাখবে। সে নিশ্চই না খেয়ে থাকবে কেউ তাকে ঘুমাতে সাহায্য করবে না , ইত্যাদি। ক্ষনিকের দুশ্চিন্তাটা আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে পারে। কেড়ে নিতে পারে ঘুম খাওয়া দাওয়া অর্থাৎ সকল স্বাভাবিকতা মায়ের জীবন থেকে। স্বামী বাসায় ফিরেন দেরি করে। কিছুদিনের মধ্যেই লক্ষ্য করেন স্ত্রীর আচরণে কিছুটা পরিবর্তন। জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী উত্তর দেন ” কিছু হয় নাই ” বলে। কিন্তু অস্বাভাবিকতা উত্তর উত্তর বাড়তেই থাকে। তৈরী হয় কাজের মধ্যে অনীহা। ঘর দোয়ার থাকতে থাকে অগোছালো। তৈরী হয় ঠুনকো রাগ। অল্পতেই এবং বিনা কারণে রেগে যাওয়ার অভ্যাস। রাত্রি জাগরণ বা অচেতন হয়ে অতি মাত্রায় ঘুমানো এমনকি দিনের বেলাতেও ঘুমিয়ে থাকার ইচ্ছা। আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা লোপ পেতে থাকে। সাধারণ চুটকি ও আগের আনন্দের উৎসগুলা হতে থাকে ম্লান ও অর্থহীন। চেহারায় দেখা দেয় নির্জীবতা। তৈরী হয় সকল সঙ্গী সাথীদের থেকে দূরে থেকে ঘরের মধ্যে একলা বসে থাকার অভ্যাস। নিজের মধ্যে নিজের বিরুদ্ধেই প্রশ্ন আসে ‘ আমার কি হয়েছে ? আমি কেন এরকম করছি ? আমারতো কোনো কিছুরই অভাব নেই। তাহলে আমি কেন এরকম হয়ে যাচ্ছি। উত্তর না পেয়ে মনটা ভরে যায় এক ধরণের হতাশায়। তৈরী হয় নিজের মধ্যেই একধরণের স্ববিরোধিতা এবং অপরাধবোধ। কখনো কখনো মনে হয় বেঁচে থেকে লাভ কি। মরে যাওয়াই ভালো। ইচ্ছে হয় ঘুমের বড়ি খেয়ে পরে থাকি। সংগোপনে তৈরী হতে থাকে জীবনকে নিঃশেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা।
এ পর্যায়ে আমি আপনাকে থামাতে চাই। জিজ্ঞেস করতে চাই আপনিকি উপরের উপস্বর্গগুলা পুরোটা বা আংশিকভাবে আপনার মধ্যে কখনো অনুভব করেছেন বা এখনো করছেন। তাহলে দেরি না করে আপনি আজই আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আমি বলবো
আপনার বিষন্নতার রোগ হয়েছে। বর্তমান দুনিয়ায় বিজ্ঞানের উন্নয়নের সাথে জটিল জীবনধারণের সম্প্রসারণে এই রোগের বিস্তৃতি বেড়েই চলেছে।উন্নত বিশ্বে এখন এটাকে আর রোগ না বলে মনের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতির পরিবর্তন বলে মেনে নেয়ার চেষ্টা চলছে। তাই প্রত্যেকটা বড় প্রতিষ্ঠানে এখন একজন মনোবিজ্ঞানীর পদ বাধ্যতামূলকভাবে রাখার প্রচলন চলছে এবং এর সুফল দিনের আলোর মত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
আপনার প্রতি আমার উপদেশ- জীবন অতি ছোট। একে অবহেলা করে কষ্ট দিবেন না। বিষন্নতা আপনার ইচ্ছাকৃত তৈরী নয়। এটা জটিল জীবন ব্যাবস্থার পার্শপ্রতিক্রিয়া। উপায় অতি সাধারণ। অনেক উন্নত ও কার্যকরী ঔষধ আপনার নিকটস্থ ঔষধের দোকানেই পাওয়া যায়। আপনার পারিবারিক ডাক্তার সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ব্যবস্থাপত্র নেন। মনে রাখবেন বিষন্নতার ঔষধ একটু ধীর গতিতে কাজ করে। আপনাকে এটার কার্যকারিতা দেখতে হলে ঔষধ ধৈর্য্য ধরে কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ খেয়ে যেতে হবে। এরমধ্যে কেউ কেউ কিছুটা পার্শপ্রতিক্রিয়া অনুভব করতে পারেন। এইক্ষেত্রে ঔষধ বন্ধ না করে আপনার ডাক্তারের সাথে আবার যোগাযোগ করুন।