জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিশে আছে সংগ্রামের ইতিহাস। একটি স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশের জন্য তিনি তুচ্ছ করেছিলেন মৃত্যুর পরোয়ানাকে। শত্রুশিবিরে বন্দী থেকেও জীবনবাজি রেখে অবস্থান নিয়েছেন মিথ্যার বিরুদ্ধে। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সত্যের সপক্ষে রেখেছেন সাহসী উচ্চারণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের তেমনই একটি অধ্যায় নিয়ে নির্মিত হয়েছে যাত্রাপালা ‘নিঃসঙ্গ লড়াই’।
এই যাত্রাপালার ঘটনা পরাম্পরায় একাত্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে তার বন্দীজীবনের সত্য ঘটনাবলি উঠে এসেছে। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে হিসেবে এটি মঞ্চে নিয়ে এসেছিল শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ। বঙ্গবন্ধুর জেলখানার বন্দীজীবনের ঘটনাপ্রবাহ অবম্বলনে পালাটি রচনা করেছেন মাসুম রেজা। দেশের দক্ষ যাত্রাশিল্পীদের সংশ্লিষ্টতায় নির্দেশনায় ছিলেন সাইদুর রহমান লিপন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (২২ আগষ্ট -২০২৩ খ্রিঃ) শোকাবহ আগষ্ট মাসে পালাটির মঞ্চায়ন হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। যাত্রাপালা আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল সহ সংস্কৃতিজনেরা। সনাতন নিয়মের বাইরে এসে ভিন্ন আঙ্গিকে বিন্যস্ত হয়েছে যাত্রাপালা ‘নিঃসঙ্গ লড়াই’ যা সত্যিই উপভোগ্য। এখানে দৃশ্যের বিভাজনে মেলোড্রামাটিক বিভজানের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের ঐতিহাসিক দিনগুলোকে পর্যায়ক্রমিকভাবে ১১টি দৃশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের মাধ্যমে ইতিহাসের সত্য ও তথ্যের সম্মিলনে ঘটনাতে গ্রহণ করা হয়েছে চ্যালেঞ্জ। সত্যকে মেলে ধরার সেই সূত্র ধরে বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইয়াহিয়া কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ তুলে আনা হয়েছে প্রাসঙ্গিক চরিত্রগুলোকে। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের ঘটনার সূত্র ধরে বিস্তৃত হয়েছে যাত্রাপালাটির কাহিনী। সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে গ্রেফতারের পর নিয়ে যাওয়া হয় লাহোর থেকে ৮০ মাইল দূরের লায়ালপুর জেলে। বিচার নামের এক প্রহসন মঞ্চস্থ হয় এই জেলজীবনে। বঙ্গবন্ধু যখন এই প্রহসনের বিচারের সম্মুখীন, উল্টোদিকে বেগবান হতে থাকে বাঙালীর স্বাধীনতার সংগ্রাম। একাত্তরের জুলাই মাসের গোড়ার দিকে ইয়াহিয়া বুঝতে পারেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে তার সেনাবাহিনী বিপুল প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং ক্রমশ পৌঁছে যাচ্ছে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন প্রতিশোধের নেশায় ইয়াহিয়া শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা করে। জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে নিবৃত্ত করে এই বলে যে, মুজিবকে হত্যা করা হলে বিশ্ব সমর্থন একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। কেবলমাত্র বিচারের মাধ্যমে তাকে সাজা দিলে সেটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে। শুরু হয় বিচার নামের প্রহসন। লায়ালপুর জেলে শুরু হয় ট্রায়াল। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ দাঁড় করানো হয়, যার ভেতরে ছয়টি প্রমাণিত হলে নিশ্চিত শাস্তি মৃত্যুদন্ড। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে ব্রোহি নামক এক ব্যারিস্টারকে নিয়োগ দেয়া হয়, যিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষের উকিল হবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সাফ সাফ জানিয়ে দেন তার পক্ষে কোন উকিলের প্রয়োজন নেই। তিনি নিজেই তার যুক্তি-তর্ক তুলে ধরবেন। বিচারে সাজানো কিছু সাক্ষী হাজির করা হয়। বঙ্গবন্ধু তার ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিতে থাকেন যে, তার বিরুদ্ধে আনা সবগুলো অভিযোগই ভিত্তিহীন এবং সাক্ষীরা টাকা খেয়ে মিথ্যে সাক্ষ্য দিতে এসেছে। তারপরেও বিচারের রায় হয় এবং রায়ে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ ঘোষণা করা হয়। তাকে লায়ালপুর জেল থেকে নেয়া হয় মিয়াঁওয়ালি জেলে, যেখানে তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। কবর খোঁড়া হয় তার জন্য। বঙ্গবন্ধু নিজেও সেই কবর খোঁড়া দেখতে পান। তবে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা ভয় পেলেন না মৃত্যুকে। কেবল বললেন, লাশটা যেন তার দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এদিকে, দেশ স্বাধীন হয় আর বিশ্বনেতৃত্বের চাপে বন্ধ হয়ে যায় ফাঁসি কার্যকরের আয়োজন। পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বিলাত ও ভারত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। এই সত্যাশ্রয়ী গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে যাত্রাপালাটি।
বঙ্গবন্ধুর জীবনী সংক্রান্ত এধরনের যাত্রায়োজন সারা দেশের গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে দাওয়ার আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সাংস্কৃতিকভাবে চর্চা করা হবে যা নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এবং উজ্জ্বল করে তুলবে।