আরিফুজ্জামান আরিফ: তামান্নার জন্মগত ভাবেই দুই হাত ও এক পা নেই। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। সে প্রমাণ করেছে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়।
এবার সে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এক পায়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।
একইভাবে পরীক্ষা দিয়ে জেএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল। সে এবারো ভালো ফলাফলের আশাবাদী।
তামান্না নূরা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের রওশন আলী ও খাদিজা পারভীন শিল্পীর মেয়ে
অদম্য পথচলা তামান্না প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা পর্যন্ত মেধা তালিকায় শীর্ষে ছিল। পাশাপাশি এডাস বৃত্তিও পেয়েছিল। ২০১৩ সালে প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) ও ২০১৬ সালে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়।
২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ঝিকরগাছার বাঁকড়া জেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্থানীয় বাঁকড়া ডিগ্রি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তামান্না নূরা।
শনিবার সকালে বাবা রওশন আলী হুইল চেয়ারে করে মেয়েকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দ্বিতীয়তলার ২০৯ নম্বর কক্ষে তার আসন পড়েছে। সেখানে আলাদা একটি চৌকিতে বসিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথেই সে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা দিয়েছে।
তামান্না নূরা জানায়, ভালো প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি। সবার কাছে দোয়া চাচ্ছি, আমি যেন ভালো ফলাফল করতে পারি।
তামান্নার বাবা রওশন আলী বলেন, মেয়েটি শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় অর্থের অভাবের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমরা কখনো ভেঙে পড়িনি। তামান্নার একটি পায়ের মাধ্যমে তার মা মেয়েকে সব ধরনের শিক্ষা দিতে থাকে। মায়ের কাছ থেকে সে অক্ষরজ্ঞান পেয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বাড়ি থেকে দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও নিয়মিত পাঠানো সম্ভব ছিল না। তাই স্থানীয় আজমাইন এডাস স্কুলে তাকে নার্সারিতে ভর্তি করা হয়। তার শ্রবণ ও মেধাশক্তি খুবই ভাল। যেকোনো পড়া একবার শুনলেই আয়ত্ত করতে পারতো।
তামান্নার মা খাদিজা পারভীন শিল্পী জানান, পায়ের আঙুলের ফাঁকে চক ধরিয়ে লেখা শুরু করে। এরপর কলম ধরিয়ে লেখা আয়ত্ত করে সে। ধীরে ধীরে পা দিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো, পায়ের আঙুলে চিরুনি ধরে মাথা আঁচড়ানো। চামচ দিয়ে খাওয়া সব কাজই সে করতে পারে।
ঝিকরগাছার বাঁকড়া জেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব হেলাল উদ্দিন খান বলেন, তামান্না অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
তার ইচ্ছাতে দ্বিতীয়তলায় সহপাঠীদের সাথে বসেই পরীক্ষা দিচ্ছে। তাকে একটি চৌকির পরে বসিয়ে দেয়া হয়। এক পা দিয়ে লিখেই বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা দিয়েছে। প্রতিবন্ধী হিসেবে ২০ মিনিট বাড়তি সময় পেয়েছে।
এবার এসএসসিতেও ভালো ফলাফল করবে এটা আমার বিশ্বাস।
তিনি আরো জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই তামান্নাকে সহযোগিতা করে আসছে। তার বাড়ি গিয়েও শিক্ষকরা পড়ায়। সহপাঠীরা বাড়ি থেকে স্কুলে আনে। আবার বাড়ি পৌছে দেয়।
শারিরীক প্রতিবন্ধী তামান্না সবার দোয়া আর ভালোবাসায় এগিয়ে যেতে চায় অনেক দুর।সহসা হোক আর পথচলা।দুর হোক আগামীর দিনের পথচলার সকল বাঁধা বিপত্তি। এটই তামান্না ও তার পরিবারের আশাবাদ।