সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও গেজেট প্রকাশের ঠিক আগে জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামো ঘিরে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। জুডিশিয়াল সার্ভিসের আওতাভুক্ত ব্যক্তিরা মূল বেতনের সমপরিমাণ বা শতভাগ ভাতা দাবি করায় বিষয়টি আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন নিয়ে এবার চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্যালোচনায় যাচ্ছে সরকার। নতুন করে তৈরি হওয়া জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সুপারিশ, আর্থিক প্রভাব এবং বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর বেতন কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্যের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী এক অনির্ধারিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে নবম পে-স্কেলের আর্থিক প্রভাব, সম্ভাব্য বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং বিভিন্ন খাতের বেতন কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ওই আলোচনায় কমিশনের প্রতিবেদন এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেতন কাঠামোর কোনো পর্যায়ে বৈষম্য কিংবা অসংগতি থাকলে তা দ্রুত সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময়সূচি আরও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না, সেটিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামো নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা পর্যালোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিটি শিগগিরই বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এর আগে গত ১২ আগস্ট কমিটির একটি বৈঠক আহ্বান করা হলেও সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে সেটি অনুষ্ঠিত হয়নি।
কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং এতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে বিচারকদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখা হবে।
একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত কত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে এবং সেই অর্থ কীভাবে সংস্থান করা সম্ভব, সে বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন খাতের বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিও কমিটির আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
এদিকে, গত ১২ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। ওই প্রস্তাবে সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেডভেদে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে তুলনামূলকভাবে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের চেয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান বৈষম্য কমানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম ধাপে শুধু মূল বেতন কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী বছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এতে সরকারের ওপর একবারে বড় ধরনের আর্থিক চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়নি। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের প্রত্যাশাও ক্রমেই জোরালো হয়েছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন খাতের পৃথক দাবির সমন্বয় করতে গিয়ে প্রক্রিয়াটি বারবার জটিলতার মুখে পড়ছে। সর্বশেষ জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত দাবি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ আসায় গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।