২.
কোনটি সড়ক দুর্ঘটনা আর কোনটি সড়কে খুন এই দুই মিলিয়ে ফেলে আমরা মনে হয় ভুল করছি। সাইদুর রহমান পায়েলের ঘটনাটা সড়কে খুন। হানিফ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব-৯৬৮৭ নম্বরের বাস থেকে সাইদুরকে ফুলদী নদীতে ফেলে দেয় বাসকর্মীরা। পরবর্তীতে তদন্ত রিপোর্টে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ জায়েদুল আলম বলেন, ‘পেটের পানিই প্রমাণ করে জীবিত সাইদুর রহমান পায়েলকে খালে ফেলা হয়েছিল।’
ঘটনাটি শোনার পর আমি হতবাক হয়ে যায়। বাস চালক এবং হেলপারের কত বড় সাহস হলে তারা এইধরনের কাজ করতে পারে। এইটা কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়। এইটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
পায়েলের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরতলির সিটি গেট এলাকায় হেলপারের সাথে কথা কাটাকাটি হওয়ায় লুসাই পরিবহনের চলন্ত বাস থেকে রেজাউল করিম নামের এক যুবককে ফেলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে রেজাউল মারা যায়।
পায়েলের ঘটনার পর রেজাউলের ঘটনাটা শুনে আমি ভয়ানক বিস্মিত হয়ে পড়েছি। আমরা সবাই কি তাহলে পরিবহন শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে আছি? পরিবহন শ্রমিকরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাবে আমরা সবাই নিশ্চুপে বসে দেখব? এইটা সম্ভব?
এইসব হত্যাকাণ্ডের যদি কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি না হয় তবে পরিবহন ও সড়ক খাতে কখনোই শৃঙ্খলা আসবে না। বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে যাবে।
শুধু সাইদুর রহমান পায়েল বা রেজাউল করিম নয় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিমের ঘটনাটিও একটি হত্যাকাণ্ড। দুইটি বাসের রেষারেষিতে কেন কোমলমতি সন্তানরা মারা যাবে? যে জাবালে নূরের (ঢাকা মেট্রো ব-১১৯২৯৭) পরিচালক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের শ্যালক মোঃ নান্নু মিয়া, তিনি কেন শাস্তির আওতায় আসবেন না? নান্নু মিয়ার একক প্রভাবে জাবালে নূর দাপটের সাথে সড়কে চলেছে এতোদিন। এখন দায় নেয়ার বেলায় শুধু সেই নিরীহ বাসচালক আর হেলপার, এইটা কোনো নিয়ম হতেই পারে না।
গোটা পরিবহন খাতটিকে জিম্মি করে রেখেছে নান্নু মিয়াদের মতো গুটি কয়েক লোক। নান্নু মিয়ারাই অধিক লোভের কারণে লাইসেন্সবিহীন চালক গাড়িতে বসায়, অশিক্ষিত লোকজন ধরে এনে গাড়ি চালাতে সাহস জোগায়, আর যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন ধামাচাপা দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। মূলত এদের কারণেই আজকে সড়কে মড়ক লেগে আছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর ৯০ ভাগই ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ অতিরিক্ত গতি। আর বেপরোয়া চালকের কারণে ঘটে ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা।
৩.
পৃথিবীর কোথাও এইরকম বিশৃঙ্খলভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় না। একমাত্র আমাদের দেশেই এইধরনের অসুস্থ মানসিকতায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। জার্মানীর গোটা শহরে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানীর মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রিত হয়। বরং সেই দেশে যোগাযোগ খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য সরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ ও নজরদারী করা হয়। আর আমাদের দেশে ঘটে তার উল্টো ঘটনা।
আজকে যে কোমলমতি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা সে রাজপথে নেমে আন্দোলন করছে। এই আন্দোলন কাদের বিরুদ্ধে? তার দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। কেন এই আন্দোলন? কারণ তার সহপাঠীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি পায়েল, রেজাউল, রাজীব ও মিমের ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ডই বলবো।
এইসব শিক্ষার্থী যারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে তাদের মনে কি ধরনের প্রভাব পড়েছে আমি তাই ভাবছি। ভবিষ্যতে এরা কাউকেই মানবে না। কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিতও হবে না। কারণ আমাদের প্রশাসন তাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। আমাদের সড়ক ও পরিবহন খাতসহ গোটা যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। এই দায় কার? শির্ক্ষার্থীদের আন্দোলনে গোটা যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে ছিল। এই ক্ষতি কার?
এই সময়ের ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত মেধাবী এইটা আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি। যদি তাদের আমরা সঠিকভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করতে না পারি তবে তাদের বিপথে যাওয়ার দায় আমাদেরকেই নিতে হবে। আমরা যেন সেইদিনের জন্য প্রস্তুত থাকি।
বিনয় দত্ত
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com