বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। চীনের শি’আনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইন্টারনেট কনফারেন্স-২০২৬-এ তিনি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পাবলিক গুডসকে কেন্দ্র করে তিন দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।
শি’আন আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন বিশ্বের সব দেশ সমানভাবে এর সুফল ভোগ করতে পারবে। প্রাচীন সিল্ক রোড যেমন বাণিজ্য, জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের পথ তৈরি করেছিল, তেমনি বর্তমানের ডিজিটাল সিল্ক রোডও বৈশ্বিক উন্নয়নের নতুন ভিত্তি হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই তরুণ। এই জনমিতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনমুখী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করেছে। পাশাপাশি জাতীয় পোর্টাল, ডি-নথি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সরকারি সেবার ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে। ভূমি রেকর্ড, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা ডিজিটাল হওয়ায় সময় ও ব্যয়—উভয়ই কমেছে।
তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফিনটেক এবং ডাটা অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ বড় পরিসরে বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্যার আগাম পূর্বাভাস এবং ড্রোননির্ভর নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ দেশের বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল সিল্ক রোডকে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, উচ্চগতির সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আসিয়ান অঞ্চলের উৎপাদন ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হচ্ছে।
সম্মেলনে তিনি যে তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জ্ঞান বিনিময় ও সক্ষমতা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা; দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যয় কমিয়ে সবার জন্য সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করা; এবং তৃতীয়ত, ডিজিটাল পাবলিক গুডসের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আইপি ও ডাটা আর্কিটেকচারকে বৈশ্বিক কল্যাণে আরও উন্মুক্ত করা।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং ডাটা উপনিবেশবাদের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও বহুপাক্ষিক সাইবার শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। আস্থা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের ডিজিটাল বিশ্ব গড়ে উঠতে পারে এবং বাংলাদেশ সেই উদ্যোগে সক্রিয় ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে চায়।
দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিশ্বের ৫২টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৮০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতাসহ নানা বিষয় গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি কোয়ালকম, লেনোভো, জেডটিই, ৩৬০, সুগন, ওয়াটারড্রপ, কিসন টেকনোলজি ও পেঙ্গুয়া ফান্ডসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সম্মেলনে অংশ নেন।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইন্টারনেট কনফারেন্স-২০২৬, শি’আন।