জীবনযাত্রার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে আয়োজিত দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ নজিরবিহীন সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা অকপটে স্বীকার করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে সোমবার (১৯ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগপত্র পেশ করলেও তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তবে সামগ্রিক গোয়েন্দা ত্রুটি ও নিরাপত্তা ঘাটতি খতিয়ে দেখে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এলিসি প্রাসাদ।
গত শনিবার জীবনযাত্রার খরচ কমানোর দাবিতে রাজধানী প্যারিসসহ পুরো ফ্রান্সে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বদলে তা নিমেষেই ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। বিভিন্ন শহরের টাউন হল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি নির্বিচার লুটপাট চালানো হয়। সংঘাতে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেশব্যাপী আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কথা স্বীকার করে বলেন, শনিবার বড় শহরগুলোর শত শত দোকান যখন লুট হচ্ছিল, তখন ব্যবসায়ীদের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তিনি অকপটে জানান, বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতাকারীদের বিশাল বহর সামলানোর ক্ষেত্রে পুলিশের ‘পূর্বাভাসের মারাত্মক অভাব’ ছিল এবং মাঠে নিয়োজিত প্রায় ৬০ হাজার পুলিশ সদস্য সেই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নৈতিক দায় নিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সার্বক্ষণিক নেতৃত্বে রাখার স্বার্থে পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা ব্যর্থতা তদন্ত করে দাঙ্গাবাজদের ব্যারিকেড ও লুটপাট গুঁড়িয়ে দিতে দ্রুত কার্যকর নতুন অপারেশনাল পদ্ধতি প্রণয়নের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রবিবারও প্যারিসে বিক্ষিপ্ত লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে; সেখানকার মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোইরে জানিয়েছেন, রাজধানীতেই অন্তত ৩০টি দোকানে হামলা হয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনের ভাষ্যমতে, সপ্তাহজুড়ে আটক হওয়া ২ হাজার ৩৩০ জনের বেশি ব্যক্তির ৭০ শতাংশই প্রাপ্তবয়স্ক। চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যালেইন দি ক্রেসেনজো জানান, ছুটির দিনের এই তাণ্ডবে দুই হাজারের বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শত মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাবে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ লাগামহীন এই তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের ক্ষমতা দিলেও আপাতত কোনো জরুরি অবস্থা বা কারফিউ জারি করেননি। মূলত গত চার সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের অসন্তোষই শনিবার এসে এমন প্রলয়ংকরী রূপ নিয়েছে।
সূত্র: ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এলিসি প্রাসাদ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম