ইদ্রিস আলম: গেল ২৯ শে জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় ‘জাবালে নূর’ পরিবহনের একটি ঘাতক বাস রেষারেষি করতে গিয়ে পাশেই যাত্রী ছাউনিতে উঠে বাসের জন্যে অপেক্ষারত বেশ কিছু স্কুলশিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলে দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজিব নামের দুই শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয় ‘জাবালে নূর’ পরিবহন নামের দুই ঘাতক বাস। তারা দু’জনেই ছিল শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলজের শিক্ষার্থী।
সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষুব্ধ স্কুল-কলজের শিক্ষার্থীরা ঘটনার দিন থেকে আজ পর্যন্ত পুরো ঢাকা শহর অচল করে রেখেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের নায্যদাবি এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রীর পদত্যাগসহ বেশ কিছু দাবি নিয়ে অবরোধের ডাক দিয়েছেন। দিন দিন শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পরছেন পরিবহন সেক্টরসহ সাধারণ চাকরীজীবিরাও।সেই সাথে বাড়ছে যানচলাচল সংকট।
বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর নিহতের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের তোপের মুখে সম্প্রতি রুট পার্মিট বাতিল হওয়া ‘জাবালে নুর’ পরিবহনের বাসগুলোকে রং ও নাম বদলে নতুন নামে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা চলছে। এমন খবর আসে জার্মান বাংলা ২৪ অনুসন্ধানী টিমের কাছে।
অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সেই সাথে বেড়িয়ে আসে রাজধানীতে বেপরোয়া ও লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার দ্বারা পরিচালনাকারী গাড়ীর মালিক কারা? যেসব মালিকদের নাম উঠে আসে তাতে বুঝতে বাঁকি থাকেনা যে ক্ষমতসীন মালিকদের কারণে রাজধানী জুড়ে লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভাররা গাড়ি চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এতে শুধু ড্রাইভাররাই সুবিধা ভোগ করেননা, তাদের সাথে সুবিধা পান মালিকরাও অল্প টাকার বিনিময়ে তাদের দিয়ে কাজে লাগানো যায়। এই লোভের কারণে প্রতিদিন ঢাকাসহ সারাদেশে এমন সড়ক দুর্ঘটনার কান্নার আহাজারি শুনা যায়। এদিকে কোন খেয়াল নাই বাস মালিকদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তুরাগ গাড়ির একজন ড্রাইভার জার্মান বাংলা ২৪ কে বলেন, “ভাই অহন যে সব পোলাপাইন গাড়ি চালাই তাগো বেশির ভাগ অপ্রাপ্ত বয়স্ক, লাইসেন্স নাইগা আবার হেরা দ্যেখেন গা গাঞ্জুট্টি,নেশা কইরা গাড়ী চালাই গা, তহন এমন দুর্ঘটনা ঘটে। হ্যেগো লাইগ্যা আমগো গাড়ি চালাইতে অহন সমস্যা হইতাচে।গাড়ি না চালাইলে বৌ পোলাপাইন গো কি খাইতাম কন দ্যেহি।”
অভিযোগের সত্যতা জানতে নাম পরিচয় গোপন রেখে টিম জার্মান বাংলা ২৪ গন্তব্য মিরপুর ১০ নম্বরের ইউসিবি ব্যাংকের পেছনের রোডে যেখানে ‘জাবালে নূর’ পরিবহন রাখা হয়। তবে এই গাড়ি বেশ কিছু জায়গাতে রাখা হয়। মিরপুর ১২তে ও রাখা হয় জাবালে নুর পরিবহন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি বাসের গায়ের আগের রং তুলে নতুন করে রং করছে রংমিস্ত্রিরা এমন কান্ড দেখে হতবাগ টিম জার্মান বাংলা ২৪ ঘটনার আরো গভীরে যেতে প্রতিবেদক বেশ গভীর সম্পর্ক তৈরি করে ঐ মিস্ত্রির সাথে জানতে হবে কেন এমন করছেন? আর নাম পরিবর্তনের বিষয় ক্লিয়ার করতে হবে? এমন প্রশ্ন নিয়ে
এক সময় প্রতিবেদক মিস্ত্রিকে চা অফার করে সাথে সাথে রাজিও হয়ে যান তিনি।
গাড়ি তো ভালোই আছে কেন ঘষামাজা করছেন? বলতেই মিস্ত্রি বলেন,” ক্যান ভাই সারাদ্যাশ জানে আর আপনি কোন দ্যাশে থাকেন। সেদিন যে জাবালে নুর গাড়ি ছাত্র মাইরা ফেলছে জানেননা? এর জন্য গাড়ির রং করা হচ্ছে অন্য কালার দিয়ে। যাতে রাস্তায় নামলে সমস্যা না হয়। কি নামে আবার আসতে পারে। খুব ভালো বুদ্ধি তো? না আমি জানি না কি নামে চালাইবো।”
এসময় গাড়িতে রং পরিবর্তনের কাজ করতে থাকা এক ব্যক্তিকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। হয়তো বা অতিচালাক তিনি টের পেয়ে যান আমরা কোন তথ্য নিতে এসেছি। তিনি বলেও ফেলেন আপনারা কি সাংবাদিক? এবার কৌশল পরিবর্তন করে টিম জার্মান বাংলা ২৪ পরিচয় গোপন রেখে বাসের রং বদলানোর সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওখানকার বসবাসকারী কয়েকজনের সাথে কথা বললে- ধীরে ধীরে জাবালে নুর নামের সব গাড়ির রং ও নাম বদলে ফেলে আলাদা নামে এই গাড়িগুলো আবার রাস্তায় নামানো হবে বলে জানান তারা। তদের এই কথায় আবার সত্যতা মেলে অন্য রং ও নাম পরিবর্তনের।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, জাবালে নূর আবার অন্য নামে বডির রঙ পাল্টে সড়কে ফিরে আসবে? সেই সাথে ফিরে আসবে সেই সব অদখ্য লাইসেন্স বিহীন নেশাগ্রস্ত ড্রাইভার। তার মানে ড্রাইভার শঙ্কা ভবিষ্যৎতে ও থেকেই গেল। আবারও রক্তের মিছিল মা বোনের সন্তান হারানোর আহাজারির যেন শেষ নেই রাজধানী জুড়ে। এতে কি কোন সমাধান হবে? বরং সমাধানের বদলে উল্টো আরো বেড়ে যাবে বলেই সংখ্যা সামাজের সচেতন মহলের।
কিছু নির্দেশনা মূলক পরামর্শ ও দাবি তুলে ধরেন সচেতন সমাজের ব্যক্তিরা, রেজিস্ট্রেশন বাতিল করলেতো আবার পুনরায় অন্য নামে দেয়া সম্ভব, সেই সুযোগটাই তারা কাজে লাগাচ্ছে। আমার তাতেও সমস্যা নেই যদি তা পুনরায় ফিরে আসে অন্য কোন নামে। আমার আপত্তি তখনি যখন ফিটনেস বিহীন বাসগুলো রাস্তায় দেখব, যেগুলো হয়ত চালাবে লাইসেন্সবিহীন অপ্রাপ্ত ওনেশাগ্রস্ত সব চালক। এই অভ্যাসের পরিবর্তন দরকার, মাননীয় মন্ত্রী দয়া করে রাস্তায় পর্যাপ্ত ডিভাইডারের ব্যবস্থা করুন, নির্দিষ্ট স্টপেজ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় স্পিড ব্রেকারসহ যাত্রীচাউনি স্থাপন করুন, রাস্তা পারাপারে প্রয়োজনে আরো ওভারপাস এবং আন্ডার ওয়ে রাস্তা তৈরি করুন, জেব্রা ক্রসিং স্পষ্ট করে দিন পাশাপাশি সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে পরিহার করে আধুনিক ট্রাফিক সিস্টেমকে গ্রহণ করুন।
অনুসন্ধানের শুরুতে বলেছিলাম যে কারা এই লাগামহীন বেপরোয়া ফিটনেসবিহীন ঘতক গাড়ির মালিক। কাদের ক্ষমতাই রাস্তায় চলে এমন ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এই সব মালিকদের ক্ষমতার জোরে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ড্রাইভার, লাইসেন্স বিহীন, নেশগ্রস্ত ড্রাইভার সুযোগ পান। এবার দেখার পালা কারা এই মালিক।
জাবালে নূর পরিবহন মিরপুর থেকে উত্তরা ও রামপুরা বনশ্রী চলাচল করে। নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের শ্যালক মো. নান্নু মিয়া (৫০) এই পরিবহনের পরিচালক। তেঁতুলিয়া পরিবহন কোম্পানির চেয়ারম্যান ভোলার এক এমপি এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম মিয়া। বসুমতি পরিবহন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দাকার এনায়েত উল্যাহর।
আজিমপুর থেকে উত্তরা পথে চলাচলকারী ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে যুক্ত রয়েছেন সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার ছেলে আরিফুজ্জামান (রনি) একজন প্রভাবশালী এমপির চাচাতো ভাইয়ের বাসও চলে ‘সূচনা-বিআরএফ’ পরিবহনে। আজিমপুর, মিরপুর-১২, কুড়িল ও সদরঘাট রুটে ৩০০ বাস চালায় বিহঙ্গ পরিবহন যার চেয়ারম্যানস্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ এবং এমডি পরিবহন মালিক খোকন মিয়া।
প্রজাপতি পরিবহনের মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ।
সম্প্রতি এক জরিপে সড়ক-মহাসড়কের মৃত্যুদানব বলে যে ১০টি পরিবহনের বেপরোয়া চলাচলের কথা তুলে আনা হয়েছিল সেসব পরিবহনের মালিকরাও একেকজন গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত। এসব পরিবহন হচ্ছে এনা, আজমেরী, এশিয়া, বিহঙ্গ, পদ্মা লাইন, পারিজাত, তুরাগ, তিশা, জাবেলে নুর, ইলিশা, প্রাইম ও হানিফ পরিবহন।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে নয়, ব্যবসায়ীদের হাতেই পরিবহন ব্যবসা আছে। তিনি বলেন, পরিবহন খাতে প্রতিনিয়ত আইনের প্রয়োগ আছে এবং সর্বোচ্চ মাত্রার প্রয়োগই হচ্ছে।
যাত্রী ও পথচারীদের দোষ দিয়ে তিনি বলেন, বরং আইনি জাঁতাকলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। সেখানে বেপরোয়া চলাচলের প্রশ্নই ওঠে না। খন্দকার এনায়েত আরো বলেন, ইদানীং বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতায়, অসচেতনতা।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসই নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত। প্রভাবশালী মালিকের ক্ষমতার দাপটে চলছে এই গণপরিবহন সেক্টর।
নগরীর ১৩টি পয়েন্টেই এ প্রতিযোগিতা বেশি থাকে। এসব পয়েন্টে যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। পয়েন্টগুলো হচ্ছে-গাবতলী, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, গুলিস্থান, মতিঝিল শাপলা চত্বর, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরার আজমপুর, বিমানবন্দর গোল চত্বর, মহাখালী ও যাত্রাবাড়ি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার সড়কে দুই লাখ যানবাহন চলাচল করার কথা থাকলেও চলছে ১০ লাখেরও বেশি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যাই প্রায় দেড় লাখ। এসব যানবাহনের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। দেশে নিবন্ধিত প্রাইভেটকারের ৭৫ শতাংশই চলছে এখানে। অথচ এসব পরিবহনে যাতায়াত করে মাত্র ৮ ভাগ যাত্রী। অন্যান্য যানবাহন বহন করে বাকি ৯২ ভাগ যাত্রী। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছে নগরবাসী।