বাংলাদেশে বাড়ছে মৌলবাদীদের দাপট, সন্ত্রাস। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল থেকেই জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরে মৌলবাদীরা নতুন করে শক্তি সঞ্চার করতে শুরু করে। পাকিস্তানি বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের মদদও পাচ্ছে তারা। সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার চেষ্টা করেও ‘মব সন্ত্রাস’ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় পীরের দরগা হিসেবে পরিচিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ হামলার ঘটনাই প্রমাণ করছে বাংলাদেশে মৌলবাদীদের দাপট এখনও কমেনি। স্থানীয়দের কাছে ‘পীর বাবা’ বলে পরিচিত দরগার প্রধান আব্দুর রহমান শামিমকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে চোখের সামনে দেখেছেন দরগার খাদেম জামিরন নেসা। তিনি বিবিসি-কে বলেছেন, ‘বিভিন্নজন নানাকথা বলছিল। আমরা শুনছিলাম যে, গ্রামের মানুষ আসবে আলোচনা করতে। পীর বাবা বলতেছিলো যে, আমার যদি ভুল হয়, আমি ওদেরটা মানবো। কিন্তু ওরা আমার সঙ্গে কথা বলুক। বাবা আলোচনা করতে চাইলো। কিন্তু ওরাতো কথা বলার কোনো সুযোগই দেয় নাই’। কুষ্টিয়ার এই ঘটনা ধর্মীয় বর্বরতার একটি উদাহরণ মাত্র। ধর্মীয় উন্মাদদের হাতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিনিয়ত হেনস্থা হচ্ছেন অনেকেই। জামায়াতের দোসর মৌলবাদীরা এখন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদন্ডের দাবি তুলেছেন জাতীয় সংসদে।
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই সুফি সমাজ, আহমাদিয়া জনগোষ্ঠী ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। জামায়াতসহ বিভিন্ন সংগঠন তাদের কট্টর সমালোচক। বিগত সরকারের আমলেও মব সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়েছে সুফি সমাজকে। অথচ, তারা চিরকালই মানবতার কথা বলেছেন। প্রচার করেছেন অহিংসার বাণী। তবু ধর্মীয় মৌলবাদীরা তাদেরকেই আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়ে তুলেছে। অনেকেই মনে করেন, সুফি বা আহমাদিয়াদের নিজেদের প্রতিপক্ষ হিসাবে ভাবতে শুরু করেছে জামায়াত। কারণ দিন দিন বাংলাদেশে উদারমনাদের মধ্যে সুফি সমাজের কদর বাড়ছে। তাই মৌলবাদীরা ভয় পেতে শুরু করেছেন। তারই ফলশ্রুতিতে মাজার বা পীর বাবার দরবার শরীফে হামলা হচ্ছেয
তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। তাই কঠোর হাতে এধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার উদ্যোগও শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান অবশ্য এধরনের হামলা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘আমরা এটা স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত যে, এধরনের ঘটনা না হতে দেয়া সরকারের অর্পিত দায়িত্ব ছিল। এবং সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এটা স্বীকার করতে চাই। আমাদের পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল। আমরা সেটা নিতে শুরু করেছি’।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসেবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি। এরমধ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনাও আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অজ্ঞাত ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে সুফি সাধক, মাজার ও ধর্মীয় আস্তানাগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে। সেসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পিটিয়ে হত্যার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’। তারা প্রকাশ করেছে ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ‘মব সন্ত্রাস’ করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হন ১২৮ জন।
মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দীপু দাস খুন হন। ময়মনসিংহের ভালুকায় গার্মেন্টস কর্মী দীপু দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যান ফ্রন্ট ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও মব সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মব সন্ত্রাসের ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। দায়িত্ব নিয়েও তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট। কিন্তু দেশবিরোধী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি তার শাসনামলে অস্থিরতা তৈরিতে সক্রিয়। তারাই জিইয়ে রেখেছে মব সংস্কৃতিকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানুষের মৌলিক অধিকার লুন্ঠিত হয়েছিল। সংস্কৃতি চর্চা হয়ে উঠেছিল অপরাধ। তাই গত বছর ১৯ নভেম্বর রাতে মাদারীপুরে একটি গানের আসর থেকে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে হেনস্থা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে নৈতিকতা শিক্ষার নামে নতুন এক স্বৈরাচার। মৌলবাদীরা সেই নব্য স্বৈরাচারের দোসর।
খোদ রাজধানী ঢাকা শহরেও তাদের দাপট রয়েছে। কুষ্টিয়ার ঘটনার মাত্র একদিন আগে ঢাকায় সমকামী সন্দেহে হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন। ধর্ম অবমানার অভিযোগ তুলে পুলিশি হয়রানিও বেড়ে গিয়েছে। ফরিদপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রদীপ পাল (৪০)। নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১০। পাবনার চাটমোহরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের দেব-দেবী নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও বানিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় দেওয়ার অভিযোগে আওলাদ হোসেন (১৯) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। এধরনের ঘটনাও বেড়েই চলেছে।
ধর্ম অবমাননা ও মব সন্ত্রাস প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জোবাইদা নাসরিন বলেছেন, ‘মূলত: কোরআনের অপমান কিংবা ইসলাম রক্ষার কথা বলে প্রথমে মানুষকে উত্তেজিত করা হয়, তারপর হামলার ঘটনা ঘটে’। মব সন্ত্রাস না থামার কারণও বর্ণনা করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘মব যে থামছে না তার পেছনে আছে রাজনীতি’। স্পষ্ট ইঙ্গিত, বিএনপি সরকারকে বিব্রত করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায় প্রধান বিরোধী দল। বিদেশি মদদে তারই ষড়যন্ত্র চলছে।
এছাড়াও রয়েছে মব সন্ত্রাসের নামে লুটপাট, সম্পত্তি দখলের মতো বিষয়ও। কুষ্টিয়ার হামলার ঘটনাতেও লুটপাট ঘটেছে। এ ঘটনায় নিহত পীরের ভাই যে মামলা করেছেন, সেখানে মাজারের সম্পদ এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে মৌলবাদীরা ব্যক্তিস্বার্থকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়। মুখে ধর্ম অবমাননার কথা বলে মানুষকে উত্তেজিত করার পাশাপাশি লুটপাটের লোভও দেখায় তারা। জমি-জায়গার বিবাদ মেটাতেও ব্যবহৃত হয় ধর্মীয় উন্মাদনা।
ধর্মীয় সন্ত্রাস মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা বাংলাদেশকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে। বেড়েছে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীদের দাপট। এই অবস্থায় নিজেদের ফায়দা লুটতে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য সাইদউদ্দিন আহমদ হানজ়ালা জাতীয় সংসদে বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আরও কড়া আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। তার দাবি, ধর্ম অবমাননায় শাস্তি হতে হবে মৃত্যুদন্ড। মব সন্ত্রাসের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশে মৌলবাদীদের পক্ষে আইনি সন্ত্রাসও চালু করতে চাইছেন বলে অনেকের আশঙ্কা।