শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজধানীতে দুইটি শীর্ষ গণমাধ্যমের কার্যালয়ে নজিরবিহীন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। গতকাল রাত আনুমানিক ১২টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর প্রধান কার্যালয় এবং ফার্মগেটে ডেইলি স্টার কার্যালয়ে এ হামলা চালানো হয়।
ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। হামলার সময় দুই কার্যালয়ের সামনে শত শত বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় ডেইলি স্টার ভবনের ছাদে অন্তত ২০ জন সংবাদকর্মী আটকা পড়েন। অগ্নিসংযোগের ফলে সৃষ্ট ঘন ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সহায়তার আকুতি জানান। আতঙ্কে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হতে থাকে। শাহবাগের দিক থেকে একটি মিছিল প্রথমে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়। সেখানে প্রথম আলো ও ভারতবিরোধী নানা স্লোগান দেওয়া হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। কাগজপত্র ও কম্পিউটার নিচে ফেলে দেওয়া হয় এবং ভবনের সামনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা খানিকটা দূরে ফার্মগেটে অবস্থিত বহুতল ডেইলি স্টার ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে তারা ভবনের ভেতরে ঢুকে অগ্নিসংযোগ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষুব্ধদের নিবৃত করার চেষ্টা করলেও অনেককে অফিস দুটির আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা যায়।
সূত্র জানায়, উত্তেজিত হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রথম আলো কার্যালয়ে প্রবেশ করে। হামলায় ভবনের বেশির ভাগ জানালার কাচ ভেঙে যায়। রাত ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ টেবিল-চেয়ার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বাইরে এনে সড়কে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় বিক্ষোভকারীদের ‘ইনকিলাব ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। প্রথম আলো কার্যালয়ের কর্মীরা নিরাপদে বের হয়ে আসতে পারলেও ডেইলি স্টার ভবনের নিচতলায় আগুন লাগার কারণে কর্মীরা বের হতে পারেননি। জীবন রক্ষায় তারা ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। ধোঁয়ার কারণে অনেকেই শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, কয়েক শ লোক একত্রিত হয়ে হামলা চালিয়েছে। তবে কারা এ ঘটনায় জড়িত, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার জানান, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অগ্নিকাণ্ডে তিনটি ফায়ার স্টেশনের আটটি ইউনিট পাঠানো হয়। তবে বিক্ষুব্ধ জনতার কারণে কয়েকটি ইউনিট পথে আটকে পড়ে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় কিছু ইউনিট প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করে। পরে পুলিশের সহায়তায় তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের আরও একটি ইউনিট যুক্ত হয়। রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং ছাদে আটকে পড়া সংবাদকর্মীদের উদ্ধার করা হয়।
এদিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “শরিফ ওসমান হাদির লড়াই ছিল গঠনতান্ত্রিক ও প্রতিষ্ঠান গড়ার লড়াই। যারা আগুন দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা হাদির আদর্শের বিরোধী। এটি একটি পরিকল্পিত স্যাবোটেজ।” তিনি সবাইকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।