জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ সেই নির্বাচনকে ঘিরেই যখন গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের মহড়া শুরু হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—ভোট কি আদৌ নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারবে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নতুন বছরের শুরুতেই একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনা দেশের মানুষকে নতুন করে আতঙ্কিত করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। কোথাও বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে, কোথাও মব সন্ত্রাসে মানুষ পিটিয়ে মারা হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো একটি ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের ইঙ্গিত দেয়, যার প্রভাব সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশের ওপর পড়ছে।
রাজধানীর তেজতুরী বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা, গাজীপুরে এনসিপি কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি, শরীয়তপুরে ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুই যুবকের মৃত্যু—এসব ঘটনা দেখায় যে সহিংসতার ধরন বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, নাশকতার প্রস্তুতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড—সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মব সন্ত্রাসের ভয়ংকর প্রবণতা। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা কিংবা শরীয়তপুর ও ময়মনসিংহে ধর্মীয় ও সামাজিক অজুহাতে মানুষ হত্যার ঘটনা সমাজে আইনের শাসনের প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, মব সন্ত্রাস এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি নিয়মিত একটি সামাজিক সহিংসতায় পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের পর শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার হলেও অস্ত্র উদ্ধারের হার তুলনামূলকভাবে কম। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র যে কোনো সময় নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে, সেই আশঙ্কা অমূলক নয়।
এই বাস্তবতায় প্রার্থীদের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। কোনো প্রার্থীকে জনসমক্ষে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলতে হয়—এটি কেবল একজন ব্যক্তির শঙ্কা নয়, বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার প্রতীক। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা চেয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ প্রস্তুতির আশ্বাস দিচ্ছে। পুলিশ সদস্যের বড় বহর, যৌথ অভিযান এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রস্তুতি কি মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারছে? অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় অভিযান হলেও পেশাদার সন্ত্রাসী ও অস্ত্রের মূল উৎস ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনার পর যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা প্রশমিত হলেও পরিস্থিতি এখনও ভঙ্গুর। বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও ছোট ছোট সহিংসতার ধারাবাহিকতা যে কোনো সময় পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তুলতে পারে। এই ‘নাজুক স্বাভাবিকতা’ ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কেবল ব্যালটের আয়োজন নয়; এটি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই আস্থা যদি ভয়ের কারণে ভেঙে পড়ে, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নির্বাচনকালীন নিরাপত্তাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। সহিংসতার শিকড় উপড়ে ফেলা, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ—এগুলোই পারে নির্বাচনের পরিবেশকে সত্যিকারের অর্থে নিরাপদ করতে।