গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ের মহাগণভবনে এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, চীনের প্রেসিডেন্ট ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান সি চিন পিং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
সি চিন পিং বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার বিপুল শক্তি ও সুবিধা প্রদর্শন করেছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ও শাসনক্ষমতার আধুনিকায়নের মান ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে এবং চীনা জাতির মহান পুনরুত্থানের গতি অপ্রতিরোধ্য।’
সি চিন পিং বলেন, ‘আমরা যদি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস রাখি, লক্ষ্য স্থির রাখি এবং ধাপে ধাপে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাই, তবে সাফল্য অবশ্যই মহান চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, মহান চীনা জনগণ এবং মহান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের হবে।’
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। চাও ল্যচি, ওয়াং হুনিং, ছাই ছি, তিং শুয়ে শিয়াং, লি সি ও হান চেং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৮০০ জন চীনা ও বিদেশি অতিথি একত্রিত হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্মদিন উদযাপন করেন।
মহাগণভবনের ভোজকক্ষে ঝাড়বাতির আলোয় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মঞ্চের ওপরে শোভা পাচ্ছিল গম্ভীর জাতীয় প্রতীক। আর লাল পতাকার পটভূমিতে ‘১৯৪৯-২০২৬’ সালটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান শুরু হলে সবাই দাঁড়িয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। বীরত্বপূর্ণ ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কুচকাওয়াজ’ সংগীতের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সভাকক্ষ।
এরপর সি চিন পিং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
প্রথমে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাষ্ট্রীয় পরিষদের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জনগণ, চীনা গণমুক্তি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দল এবং দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের উৎসবের শুভেচ্ছা জানান।
তিনি হংকং ও ম্যাকাও বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের স্বদেশবাসী, তাইওয়ানের স্বদেশবাসী এবং বিদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চীনের নির্মাণ ও উন্নয়নকে সমর্থন করে আসা বন্ধুপ্রতিম দেশ ও আন্তর্জাতিক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সি চিন পিং উল্লেখ করেন, ৭৭ বছর ধরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্ব দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এর ফলে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতার দুটি বড় অর্জন হয়েছে। সর্বাত্মকভাবে সচ্ছল সমাজ গঠনের প্রথম শতবর্ষের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং সমাজতান্ত্রিক আধুনিক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের দ্বিতীয় শতবর্ষের লক্ষ্যের দিকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা নতুন চীনের বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণকারী অর্জনে অত্যন্ত গর্বিত এবং চীনা শৈলীর আধুনিকীকরণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।’
সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, ‘চলতি বছর থেকে সারা পার্টি ও দেশের জনগণ উদ্যম ও পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলছে। চাপের মধ্যেও আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, নতুন ও উন্নত দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা ও প্রাণশক্তি প্রদর্শন করছে। পার্টি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে নতুন অগ্রগতি অর্জন হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই স্থিতিশীলতার মধ্যে অগ্রগতির মূল সুর বজায় রাখতে হবে, নতুন উন্নয়ন ধারণা সম্পূর্ণ, সঠিক ও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, নতুন উন্নয়ন কাঠামো দ্রুত গড়ে তুলতে হবে, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ আরও গভীর করতে হবে এবং উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় করতে হবে।’
সি বলেন, ‘একই সঙ্গে অর্থনীতিকে ধারাবাহিকভাবে আরও উন্নত করতে হবে, জনগণের জীবনযাত্রার মান কার্যকরভাবে সুরক্ষা ও উন্নত করতে হবে, বছরের নির্ধারিত লক্ষ্য ও কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনার একটি সুষ্ঠু সূচনা নিশ্চিত করতে হবে।’
হংকং ও ম্যাকাও সম্পর্কে সি চিন পিং বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’, ‘হংকংয়ের মানুষ হংকং শাসন করবে’, ‘ম্যাকাওয়ের মানুষ ম্যাকাও শাসন করবে’ এবং উচ্চমাত্রার স্বায়ত্তশাসনের নীতি দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। হংকং ও ম্যাকাওকে জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে ও এতে অবদান রাখতে সহায়তা করতে হবে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘দুই তীরের মধ্যে আদানপ্রদান ও সহযোগিতা গভীর করতে হবে, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ চাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে দৃঢ়ভাবে আঘাত করতে হবে, বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে হবে, দুই তীরের সম্পর্কের শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন এগিয়ে নিতে হবে এবং মাতৃভূমির পুনঃএকীকরণের মহান কাজ এগিয়ে নিতে হবে।’
সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হবে, চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে হবে, মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি গঠন এগিয়ে নিতে হবে এবং পরিবর্তন ও বিশৃঙ্খলায় ভরা বিশ্বে আরও নিশ্চয়তা ও ইতিবাচক শক্তি যোগাতে হবে।’
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আনন্দময় সংগীতের সুরে চীনা ও বিদেশি অতিথিরা একসঙ্গে পানপাত্র তুলে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উদযাপন করেন। তারা চীনের সমৃদ্ধি ও সমৃদ্ধিশালী ভবিষ্যৎ, জনগণের সুখ ও কল্যাণ কামনা করেন এবং চীনা জনগণের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণের চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের শুভকামনা জানান।
সূত্র: স্বর্ণা, ফয়সল, লিলি, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।