সম্পাদকীয়: বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩রা নভেম্বর এক শোকাবহ ও কলঙ্কিত দিন-জেল হত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতির চার নেতাকে তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি সেদিন শুধু চারজন নেতাকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, রাষ্ট্রচেতনা ও বাঙালি জাতির রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকেই হত্যা করতে চেয়েছিল।
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র আড়াই মাস পর। স্বাধীনতার স্থপতি নিহত হওয়ার পর দেশ যখন গভীর শোকে স্তব্ধ, তখন জাতীয় নেতৃত্বের উত্তরসূরিদের পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। জেলখানার মতো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার স্থানে এমন হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি শুধু রাজনৈতিক হত্যাই নয়, বরং ছিল একটি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা।
জাতীয় চার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নিকটতম সহযোদ্ধা, স্বাধীনতার নেপথ্য নায়ক। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে সংগ্রামকে সুসংগঠিত করেছিলেন। তাঁদের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও ত্যাগের ফলেই ১৯৭১ সালে জাতি স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। অথচ স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর সেই চার নেতার জীবন কেড়ে নেওয়া হয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই।
আজকের দিনে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে বটে, কিন্তু জাতি কি সত্যিই মুক্ত হয়েছে এর রাজনৈতিক পরিণতি থেকে? ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার শত্রুরা কখনও সম্পূর্ণ পরাজিত হয় না, যদি আমরা নিজেদের মূল্যবোধ ভুলে যাই। তাই জেল হত্যা দিবস কেবল শোকের দিন নয়; এটি জাতিকে আত্মসমালোচনারও আহ্বান জানায়-আমরা কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে অটল আছি?
জাতীয় চার নেতার আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে যে দেশপ্রেম মানে কেবল স্লোগান নয়, তা এক অবিচল বিশ্বাস-ন্যায়, সততা ও আদর্শের প্রতি আনুগত্য। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশকে সাম্যের, মানবতার ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা।
জেল হত্যা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জাতির সেই চার মহান সন্তানকে-যাঁদের রক্তে রঞ্জিত এই মাটিই আজ আমাদের গণতন্ত্রের শেকড়। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের পথ দেখাক, সততার আলোয় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।