সম্পাদকীয়: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে গঠনমূলক ঐকমত্য প্রয়োজন
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতবিনিময়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল দেখতে চায়। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ঘিরে যেসব প্রস্তাব এসেছে, তা রাজনীতির ভবিষ্যত গঠনপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কমিশনের প্রস্তাবে যুক্ত হওয়া দুই বিচারপতির বিষয়টি এই প্রক্রিয়াকে আরও নিরপেক্ষ করতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে বিচারপতিদের সত্যিকার নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ওপর। পাশাপাশি তিনি নারীদের ১০ শতাংশ (৩০টি) আসনে সরাসরি নির্বাচন চেয়ে বলেছেন, বাস্তবতা বিবেচনায় এটি একটি ধাপে ধাপে এগোনোর প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বিএনপির সংসদে পাঠানোর প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, মৌলিক সংস্কারের ভিত্তি না থাকলে ‘জুলাই সনদ’ কেবল এক প্রকার রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র হয়েই থাকবে, যার আইনি ভিত্তি থাকবে না। এছাড়া তিনি সরাসরি নারী আসনে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু তাঁর বক্তব্যে একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন—যদি বিতর্কমুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পায়, তবে গণতন্ত্র আরও হুমকির মুখে পড়বে। তিনি নিরপেক্ষ উপদেষ্টা বাছাইয়ে ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতির কথা বলেন, যা একটি যুগান্তকারী ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন, সব নিবন্ধিত দল নয়, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মধ্য থেকেই তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টার নাম প্রস্তাব করা উচিত। কারণ বাস্তবে অনেক নিবন্ধিত দলের কার্যক্রম নেই এবং তারা রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে না।
এই বক্তব্যসমূহ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট- দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং টেকসই নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাস্তবভিত্তিক ঐকমত্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঘিরে কোনো বিভ্রান্তি নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাই জরুরি। একই সঙ্গে নারী প্রতিনিধিত্বকে কোটার সীমা থেকে বের করে সরাসরি নির্বাচনের পথে নিয়ে যাওয়া উচিত তা ধাপে ধাপে হোক বা নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ার এই সময়টিতে দলগুলোর কণ্ঠে যেমন গঠনমূলক প্রস্তাব এসেছে, তেমনি কিছু বিষয়ে এখনও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এসব ইস্যুতে দ্রুত ঐকমত্য ও আইনি ভিত্তির মাধ্যমে কার্যকর রূপ দেওয়াই পারে আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক করতে।