নিচের মঠটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাটের সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের কোদলা গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
অবকাঠামোটি আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীতে তৈরি করা হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। এ মঠের নাম কোদলা মঠ হলেও স্থানীয়ভাবে এটি অযোধ্যা মঠ নামেও পরিচিত।
স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এবং বই-পুস্তক, বিভিন্ন লেখা ও প্রকাশনায় স্থাপনাটি অযোধ্যার মঠ বা কোদলার মঠ- দুটি নামেই পরিচিত।
মঠটিতে খোদাই করা একটি লেখা রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, লেখাটি ছিল- ‘শর্মনা উদ্দিশ্য তারকং(ব্রক্ষ্ম) দোহাং বিনির্মিত:।।’
সংক্ষিপ্ত ও খন্ডলিপিটির সঠিক অর্থ নিরূপণ করা না গেলেও যতদূর পাঠোদ্বার করা যায় তা থেকে অনুমান করা হয় “তারকের (জনৈক ব্রাহ্মণ কার্তিক) প্রাসাদ বা অনুগ্রহ লাভের জন্য এ মঠটি সম্ভবত একজন ব্রাহ্মণ (শর্মনা) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
মঠের নির্মাণ নিয়ে যে সকল তথ্য জানা যায় এবং সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত বারো ভুঁইয়ার অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের উদ্যেগে তার গুরু (সভাপন্ডিত) অবিলম্ব সরস্বতীর স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে মঠটি নির্মাণ করা হয়।
রাজা প্রতাপাদ্যিতের শাসনমাল থেকে জানা যায়, সে সময় সমগ্র বাগেরহাট তাদের শাসনাধীন ছিল। বিশেষ করে প্রতাপাদিত্যের কাকা বসন্ত রায়ের মৃত্যুর (প্রতাপাদিত্য তার কাকাকে হত্যা করেন) আগে বলেশ্বর নদী পর্যন্ত এলাকা ছিল তাঁদের অধীনে।
প্রতাপাদিত্য তার কাকাকে হত্যা ও জামাইকে হত্যাচেষ্টা করা স্বত্বেও বহু পন্ডিতকে বৃত্তি দিতেন তিনি। সভাপন্ডিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যর বন্ধুকবি অবিলম্ভ সরস্বতী। তিনি মুখে মুখে দ্রুত কবিতা রচনা করতে পারতেন বলে তার নাম অবিলম্ব সরস্বতী হয়েছিল।
অযোধ্যা বা কোদলার মঠের চারপাশে অলঙ্করণ করা কারুকাজ। বর্গাকার চতুস্কোণ বিশিষ্ট ভিতের উপর নির্মিত হয়েছে অযোধ্যা বা কোদলার মঠটি। উচ্চতা আনুমানিক ১৮.২৯ মিটার। প্রাচীরগুলি চিকন ইটের তৈরি, পুরুত্ব ৩.১৭ মিটার। ভেতরের প্রত্যেক দেয়াল বর্গাকার, দৈর্ঘ্য ২.৬১ মিটার।
দেয়ালের ইট লাল পালিশ করা। অযোধ্যা বা কোদলার মঠের প্রবেশপথ ৩টি। পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে এ প্রবেশ পথগুলি।
ধারণা করা হয়, দক্ষিণ দিকের পথটি মূল প্রবেশপথ। এই প্রবেশপথের ওপরে আদি বাংলায় মঠটি সম্পর্কে খোদাই করে লেখা রয়েছে।
উড়িষ্যা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত যে ‘রেখা’ নমুনার মন্দির নির্মাণ পদ্ধতি দেখা যায় তার প্রভাব এ মঠে আছে বলে ধারণা করা হয়। অযোধ্যার মঠ বা কোদলার মঠ কোন দেব মন্দির নয়, সম্ভবত: মৃত মহাত্মার সমাধিস্তম্ভ।
মঠের বাইরের দিকের প্রত্যেক পার্শ্ব দেয়াল বহুভূজ এবং পাঁচটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। বাইরের দিকের সম্মুখভাগের প্রত্যেক অংশে ছয়টি সমতল এবং এগারোটি কুলুঙ্গি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে বহুভূজ আকৃতির এই পাঁচটি কুলুঙ্গি।
বাইরের দেয়ালের ডিজাইনে নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমান্বয়ে চক্রাকারে বলয় তৈরি করে উঁচুতে সরল অনুভূমিক রেখা সৃষ্টি করে উঠে গিয়েছে। মঠের বহির্ভাগের এ অলংকরণই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণীয় স্থান।
পিরামিডের অনুরূপ উঁচু স্থাপত্যিক গঠনই একে শিখর স্টাইলের সঙ্গে অঙ্গীভূত করেছে। মঠের ভেতরের অংশে ১২/১৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা গম্বুজ ফাঁকা তলদেশর আকারে ওপরে উঠে গিয়ে শেষ হয়েছে। অনেকে ধারণা করেন, এর ওপরেও মঠের অভ্যন্তরে শূন্য/ফাপা আছে।
আশীষ কুমার দে: সাংবাদিক, লেখক ও অধিকারকর্মী