যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ৪০তম ফোবানা সম্মেলনে মৌলিক গান পরিবেশন করে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন দীর্ঘদিনের প্রবাসী জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নওশীন মনজুর-ই-খুদা। সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি।
এবারের ফোবানা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনা ও ইমরান। তাদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে জমে ওঠে সম্মেলনের সাংস্কৃতিক আয়োজন। এরই ধারাবাহিকতায় নওশীনের মৌলিক গানও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে।
প্রবাসে নিজের দীর্ঘ সংগীতযাত্রার স্মৃতিচারণ করে নওশীন মনজুর-ই-খুদা বলেন, সময়ের পাতা উল্টালে তাঁর সামনে ভেসে ওঠে অসংখ্য স্মৃতি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মায়ের সঙ্গে তরুণ বয়সে কানাডার মন্ট্রিয়েলে পাড়ি জমানোর পরও সংগীত থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে সেখানে ‘টোয়েন্টিফোর ইথনিক চ্যানেল’-এ কাজের সুযোগ পান। বাংলাদেশের পতাকা সঙ্গে নিয়ে প্রবাসের মাটিতে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথচলা শুরু হয় সেখান থেকেই।

মন্ট্রিয়েলে ওই চ্যানেলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে একক সংগীত অনুষ্ঠান করার সুযোগ পান নওশীন। প্রতি তিন মাস অন্তর তিনি আয়োজন করতেন বিশেষ অনুষ্ঠান। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসকে ঘিরে তাঁর অনুষ্ঠানগুলো তখন উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি পায়। সে সময় উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের জন্য টেলিভিশনে প্রচারিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিসরও ছিল সীমিত।
নওশীনের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগীতপ্রেমী মন্ট্রিয়েলের অধ্যাপক ড. হেতায়েত উল্লাহর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় তিনি টেলিভিশন অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন ভারতীয় কনসার্টেও সংগীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ পান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ফোবানার সঙ্গেও যুক্ত হন।
ফোবানার বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মন্ট্রিয়েল ও টরন্টোতে একক সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা পান নওশীন। টরন্টোর একটি কনভেনশনে তাঁর পরিবেশনা শুনে সেখানকার এক মিউজিক ডিরেক্টর তাঁকে মৌলিক গান রেকর্ড করার প্রস্তাব দেন। সেই সূত্রেই টরন্টোতে রেকর্ড হয় তাঁর সিডি ক্যাসেট ‘লক্ষ্মী আমার মা’, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশেও গীতালি আকারে প্রকাশিত হয়।
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত মন্ট্রিয়েলে অনুষ্ঠিত কানাডিয়ান ইয়ুথ কনসার্টে নিয়মিত অংশ নিয়ে প্রশংসা অর্জন করেন নওশীন। বাংলা মন্ট্রিয়েলের এথনিক টেলিভিশনেও তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর পরিবেশনায় জাতীয়তাবোধের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

নওশীন বলেন, তাঁর প্রতিটি সাংস্কৃতিক আয়োজনেই বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধকে সামনে রাখার চেষ্টা থাকে। অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে হিন্দি গান পরিবেশন করলেও নিজের দেশের গান তাঁর কাছে সর্বাগ্রে। তিনি বলেন, ‘আমি যে সব অনুষ্ঠান করি, তার সবগুলোতেই জাতীয়তাবোধকে উঁচু করে ধরতে চাই। অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে হিন্দি গানও গাইতে হয়, কিন্তু আমার দেশের সংগীত হলো আগে।’
বোস্টনে অবস্থানকালে পাশ্চাত্য সংগীতের অন্যতম সমৃদ্ধ ধারা অপেরার ওপরও পড়াশোনা করেছেন নওশীন। সংগীতের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি এ পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি মৌলিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। প্রবাসে থেকেও বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ সম্পৃক্ততা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরার একটি ধারাবাহিক প্রয়াস।