মানুষের জীবনের হারিয়ে যাওয়া কিছু কিছু স্মৃতি আজীবন সঙ্গে থাকে। শত চেষ্টা করলেও তা মন থেকে মুছে ফেলা যায়না। আজ ৫১ বছরের স্বাধীনতা আমাদের। বিজয় দিবস এলেই আবার নতুন করে মনে পড়ে যায় বহু বিভীষিকাময় স্মৃতি। ৭১এর ১৬ই ডিসেম্বর থেকে ৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট মাত্র ৩ বছর ৮মাসের নতুন দেশ ছিল আমাদের আর এর ই মাঝে ঘটে গেল সেই চরম লোমহর্ষক বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। যার শিকার হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর গোটা পরিবার। আমার হারানো অকৃত্রিম বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর ই স্মৃতি নিয়ে আজ আমার এই লেখার প্রয়াস।
আমি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান(সম্মান)বিভাগে ভর্তি হই। শেখ কামাল ছিল আমার সহপাঠি। অচিরেই আমরা অর্থাৎ কিছু ছেলে এবং মেয়েরা মিলে আমাদের বন্ধুদের একটা দল তৈরী হয়ে গেল। শেখ কামাল এবং আমিসহ আমরা বেশ ক’জনা খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। আমাদের সময় ছেলে মেয়েদের এমন বন্ধুত্ব খুব একটা দেখা যেতনা। আমাদের বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. নাজমুল করিম স্যার প্রায়ই বলতেন “তোমরাতো হচ্ছ রয়্যাল ব্যাচ, আমার ইচ্ছে হয় আবার আমি তোমাদের সাথে পড়াশোনা করি”।
একসাথে ঘোরাফেরা, টি এস সি তে আড্ডা দেয়া, চাইনিজ খেতে যাওয়া আরো কত কি। নাটকের রিহার্সেলে কামালের অভিনয় দেখতে গিয়ে নায়িকার ভূমিকায় আমার প্রক্সি দেয়া, দলবল নিয়ে সব বন্ধুদের, আমার এবং কামালের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া সব যেন স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে আছে। শেখ কামাল ছিল অসাধারন এক ব্যক্তিত্ত্ব তাঁর নিঃসার্থ বন্ধুত্ব বার বার আমায় মুগ্ধ করেছে। সে ছিল ছাত্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং জড়িত কিন্ত কখনোই এব্যাপারে আমাদের অর্থাৎ বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেনি। আর তাই ছাত্র রাজনীতিতে অংশ না নিয়েও পর পর দু’বছর আমি শ্রেনী প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম আর সেটা নির্বাচন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয় বরং ছিল সকল সহপাঠিদের অভিপ্রায় এবং অনুমোদনে।
আমার দেখা বন্ধু শেখ কামাল ছিল অত্যন্ত সহজ সরল অমায়িক বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন বন্ধু শেখ কামাল সত্যিকার অর্থেই আমাদের খুব ভালো বন্ধু ছিল। সে যে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে ছিল সেই অহমিকা কোনদিনই তার কোন কথায় বা আচরনে প্রকাশ পায়নি। বেঁচে থাকলে আজ সমগ্র বাংলাদেশ তার এই সকল গুনে মুগ্ধ হত এবং তার নামে রটে যাওয়া সকল অপপ্রচারের অবসান ঘটতো।
সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি। তারিখটা মনে নেই। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ঢাকায় তখন প্রচণ্ড গরম। সেই সাথে বইছিলো রাজনীতির ও গরম হাওয়া। মিছিল আর শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথ যেন হয়েছিল এক অচেনা যুদ্ধক্ষেত্র। ইউনিভার্সিটি বন্ধ। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়ে সেই সময় বাসায় বসে শুধু খবর শোনা, মায়ের ঘর সংসারে একটু আধটু সাহায্য করা, বই পড়া, সেলাই করা রান্না করা ইত্যাদি ছাড়া আর কিছুই ছিলনা করার। ছেলেবেলা থেকেই আমার রান্না বান্নায় প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল বলে এই ঘরে বসে থাকার সুযোগটা আমি পরিপূর্ণ ভাবে রান্না ঘরে ব্যাবহার করতে পেরেছিলাম।আমার মায়ের হাতের প্রচুর মুখোরোচক রান্না আমি এই সময়ে আয়ত্তে এনে আমার বাবার ভূয়সী প্রশংসা ও পেয়েছি।
আমার বাবা ছিলেন তৎকালীন একজন ব্যাংকার। কিছুদিন আগেই সম্পূর্ণ উত্তর বঙ্গের দায়িত্ব নিয়ে রাজশাহীতে তার বদলী। আমরা তখনো ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোডে বসবাস করছি। এমনি এক পড়ন্ত বিকেলে বন্ধু শেখ কামাল আমাদের বাড়ীতে এলো। ৩২ নম্বর থেকে বড় রাস্তা না ধরে পায়ে হেঁটে ও ভিতরের রাস্তা দিয়ে এলো। এসেই জানালো রাজনৈতিক আবহাওয়া ভালো নয় এই সময়ে আমাদের এই বাড়ীতে আব্বাকে ছাড়া থাকাটা ঠিক হবেনা। বলেই আর দেরি না করে চলে গেল। আমি সাথে সাথে আব্বাকে ফোন করলাম। পরদিনই আব্বা আমাদের রাজশাহী নিয়ে যেতে ঢাকা চলে এলেন। বন্ধুবর শেখ কামালের সেই বন্ধুসুলভ হুশিয়ারি বার্তা বয়ে আনার ছবি আজো আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
সেই অকৃত্রিম বন্ধুত্বের কথা ভেবে আজও হৃদয় আমার আপ্লূত। তার পরের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম ছাড়া আমাদের সবারই জানা। দেশ স্বাধীন হোল। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়ে আমরা সবাই ফিরে গেলাম ইউনিভার্সিটিতে কাজে কর্মে দৈনন্দিন জীবনে। তারপর নতুন দেশে আবার নতুন করে আমাদের বাঁচার প্রচেষ্টা।
১৯৭৩ সালের জুন মাসে আমার বিয়ে হয়ে গেল। ৭৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে অনার্স পরীক্ষা দিয়ে আমি পাড়ি জমালাম সুদূর কানাডাতে। সেই ছিল আমার বন্ধু শেখ কামাল ও তাঁর সহধর্মিণী বন্ধু সুলতানার সাথে শেষ দেখা।
পরবর্তীতে সেই পড়ন্ত বিকেলের জন্য আমি তাঁকে পর্য্যাপ্ত ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম কিনা আজ আর তা মনে নেই। তাই আজ আমার এই সামান্য লেখাতে জানাই বন্ধু শেখ কামাল তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ! যেখানেই থাকো বন্ধু, ভালো থেকো।
আমার প্রবাস জীবনে সেই যুগে এই আধুনিক প্রযুক্তির অবর্তমানে আমি সব সময় ই চিঠির মাধ্যমে আমার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চেষ্টা করেছি। তাই কামাল এবং খুকীর বিয়ের খবরে যতটা চমৎকৃত হয়েছিলাম তেমনি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা শুনে। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলামনা সেই রূঢ় সত্যকে। ৫ই অগাষ্ট ছিল তাঁর জন্মদিন। সেদিনও তো সে জানতে পারেনি আর মাত্র দশ দিন পর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে সে চিরতরে চলে যাবে।
মাঝে মাঝে মনে হয় কামাল আজ যদি তুমি আমাদের মাঝে থাকতে তাহলে কেমন হতো? বয়সের ছাপে তোমার সেই তরুন মুখাবয়ব আজ কেমন হতো দেখতে? ঢেউ খেলানো কালো চুলে রূপালী রেখা কেমন মানাতো তোমায়? সুলতানা(খুকী) আর দু চারটে ছেলে পুলে নিয়ে কেমন হতো তোমাদের ভরা সংসার? তোমার সাথে আমাদের বন্ধুদের কাটানো ইউনিভার্সিটির সেই দিনগুলো, কলা ভবনের সেই করিডোর, সেই ক্লাসরূম, আমাদের শিক্ষকগন আর তাদের দেয়া শিক্ষা, টিএসসি, লাইব্রেরী, দল বেঁধে চাইনিজ খেতে যাওয়া, মধুপুরের বনে বনভোজনের আয়োজনের জন্য আগের সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে তোমার বাজার নিয়ে আমাদের বাড়ীতে আসা তারপর সেই বনভোজনে আমার রান্না করা মোরগপোলাও সবাই মিলে হৈচৈ করে মজা করে খাওয়া, সোনারগাঁও, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় শিক্ষাসফরে গিয়ে একসাথে সবাই মিলে আনন্দে কিছুদিন কাটানো, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে আমাদের হুটোপুটি, কটেজে ফিরে তোমাদের (ছেলেদের) আনা ভেজা কাঠের খড়ি দিয়ে চোখ মুখ লাল করে আমার সেই রান্না করা, রাতের খাবারের পর সেই গানের জলসা সব কিছু মনে পড়ে আজ বিষণ্ণে মন ভারাক্রান্ত। বন্ধু, কেন তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে? কি ক্ষতি হতো যদি আমাদের মাঝে আজ ও তুমি বেঁচে থাকতে? মনের কোনে তোমার অকৃত্রিম বন্ধুত্বের আরো কত যে স্মৃতি আছে তা আজ আর লিখে শেষ করা যাবেনা। শুধু অন্তরের মাঝে স্মৃতিগুলোকে লালন করে রেখেছি। মাঝে মাঝে ওরা এসে আমায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার সেই ফেলে আসা ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে।
বহু বছর পর ঢাকার অদূরে পূবাইলে আয়োজিত হয়েছিল আমাদের সতীর্থ মিলন মেলা। কত যে পরিচিত মুখের সাথে আবার নতুন করে হল পরিচয়! হল নতুন বন্ধুত্ব। সেই আনন্দ ভরা দিনে আমরা আবার ও ফিরে গিয়েছিলাম ৬৯-এ। ছিলেনা শুধু তুমি, ছিলনা সুলতানা(খুকি), ছিলনা আরো কিছু প্রিয় মুখ। তোমরা বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলে বন্ধু। সময়ের প্রবাহে ধীরে ধীরে আরো অনেকেই চলে গেছে আমাদের ও যাবার দিন হয়তবা বেশি দূরে নয় তাই যারা এখনো আমারা আছি জীবনের এই গোধূলি লগ্নটাকে আরো একটু উপভোগ করলে মন্দ কি? তবে যতদিন বেঁচে আছি ততদিন বন্ধু তুমি স্মৃতির পাতায় রইবে অম্লান হয়ে।
জাহান সৈয়দ মিনা
ওকভীল, অন্টারিও, কানাডা।