স্বাগত জানাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতিকে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর মনোভাবের ওপর ভিত্তি করেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে। চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নিয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ছাত্রলীগের ইতিহাসে এই প্রথম সংগঠনটির শীর্ষ দু’জন নেতার পদ হারানোর ঘটনা ঘটলো। তাদের স্থলে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পেয়েই তারা এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ছাত্রলীগ চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ বা কোন অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেবে না।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শাজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে বেড়ে ওঠা খালেদ ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস আরামবাগে তার পরিচালিত ক্যাসিনো থেকে আটক করা হয়েছে শতাধিক ব্যক্তিকে। খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ইয়ংমেনস ক্যাসোনো ক্লাবের সভাপতি । এ সময় ক্লাবের ভিতরে জুয়ামত্ত ১৪২ জনকে আটক করে র্যাব। তার মধ্যে দুজন নারী, একজন বিদেশিও রয়েছে।
বেশ কদিন ধরে খবর হচ্ছে দলের বিতর্কিত, দুর্নীতিগ্রস্ত, বিভেদ সৃষ্টিকারী, বিদ্রোহী, অনুপ্রবেশকারী এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্ক নেই এমন নেতাদের আমলনামা যাচ্ছে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ইয়াবাখোর ও মাদক ব্যবসায়ে জড়িতদের রেহাই মিলবে না, এমন আভাসও মিলেছে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকে।
আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা আছে। তার আগেই দলের সুনাম নষ্টকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন দলীয় সভাপতি। সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। এবার আটক হলেন যুবলীগ নেতা। এই ধারাবাহিকতা রাখতে চান মূল দলেও।
একটি রাজনৈতিক দলের এমন উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও সুদৃঢ় হবে। প্রতিষ্ঠিত হবে সুশাসন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে অনেক বেশি। মানুষের আস্থা অর্জনই শুধু নয়, এই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্বও তাদের। দলটি ইতিপূর্বে তার প্রমাণ রেখেছে।
রাজনৈতিক দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও সক্রিয় করতে হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। এতে দলীয় নেতাকর্মীরা যেমন নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় সচেষ্ট থাকবেন, তেমনি দলীয় ভাবমূর্তিও অটুট থাকবে। বৃহৎ একটি দলে সব ধরনের মানুষের ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আওয়ামী লীগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক অসাধু অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এদের কাজের দায় আসছে দলের ওপর। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অন্যরা সতর্ক হবে, পাশাপাশি দলের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা মনে করি।
আওয়ামী লীগের এই শুদ্ধি অভিযানকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও এই পথ অনুসরণ করা উচিত। কারণ কমবেশি সব রাজনৈতিক দলেই অসাধু ও নৈতিকস্খলন ঘটা ব্যক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। তাদের কারণে দলের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হচ্ছে। যাদের জন্য রাজনীতি সেই সাধারণ মানুষ তাদের অপকর্মে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের কল্যাণে কাজ করার পরিবর্তে অসাধূ নেতাকর্মীরা মানুষের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। রাজনীতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা প্রকট হচ্ছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দুর্নীতিবাজ যেই হোক, সে জনপ্রতিনিধি হোক আর প্রশাসনের লোক হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
২১ সেপ্টেম্বর, শনিবার দুপুরে বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতির অভিযোগ পেলে প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দুর্নীতিবাজ যেই হোক, কেউ রেহাই পাবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি করছেন, নিয়ম ভঙ্গ করেছে, অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে তাদের নজরদারিতে রেখেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। যাদের বিরুদ্ধে আমরা অনৈতিক কাজের অভিযোগ পাচ্ছি, সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে টাকার পাহাড় নিয়ে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন প্রভাবশালী ঠিকাদার যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। যুবলীগ নেতা জি কে শামীম প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জি কে শামীমের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ ছিল, সে অনুয়ায়ী আমরা তাকে বিচারের মুখোমুখি করছি।
এইক দিন অস্ত্র ও ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ।
প্রধানমন্ত্রী দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতিকে একটি চ্যালেঞ্জ মনে করছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করছি। যেখানে দুর্নীতিবাজ ও নিয়ম ভঙ্গকারী আছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কেউ রেহাই পাবে না। এটা আমাদের ওয়াদা।
তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের শুদ্ধি অভিযানে তাদের গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু নেই। আমরা মনে করি, তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। ভালো কিছু গ্রহণ করতে দোষের কিছু নেই। দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন আছে। দল ক্ষমতায় না থাকলেও বিএনপিতে পদ-পদবি বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভিন্ন সময় বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। যারা এসব করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দল কতটা কঠোর হয়েছে, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের জন্য এটাও একটা শিক্ষার বিষয়। আশা করি বিএনপি তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করবে এবং দুর্নীতি ও সকল প্রকার অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতিকে স্বাগত জানিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সর্বস্তরের সচেতন মহল এগিয়ে আসবেন। সফল হোক আওয়ামী লীগের শুদ্ধি অভিযান। আসুন সত্য-ন্যায়ের শিক্ষা নিয়ে দেশ গড়ার কাজে আমরা সবাই এগিয়ে আসি।
সম্পাদক ও প্রকাশক
জার্মানবাংলা২৪.ডটকম