শিরোনাম :
কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ২৯৪, নিখোঁজ ৩২০ পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়নের ভারসাম্যে চীনের সাফল্যের প্রশংসায় জাতিসংঘ ফিল্ডস পদক চীনের বিশ্বমানের গণিত গবেষণার প্রমাণ: মার্টিন হেয়ার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত আদালতের, প্রত্যর্পণ নিয়ে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার আলোচনা জার্মানিতে একসঙ্গে পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার চাপ; ইউক্রেন যুদ্ধেও বাড়ছে উদ্বেগ নারী শিক্ষায় নতুন উদ্যোগ, অনার্স পর্যন্ত সব খরচ বহন করবে সরকার নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে ফের অনিশ্চয়তা, জুডিশিয়াল সার্ভিসের ভাতা নিয়ে জটিলতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন রূপকথা তীব্র গরম-খরায় বিপর্যস্ত জার্মানি, দাবানল থেকে নদীর পানিসংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিশ্বজয় এবং ‘আকবর দ্য গ্রেট’

শামস রহমান, বার্তা প্রধান (বাংলাদেশ)
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে বাংলাদেশ যুব ক্রিকেটের অধিনায়ক আকবর আলী

সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকান শহর পোচেস্ট্রুমের মাঠে অনূর্ধ্ব উনিশের যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কল্যাণে বাংলাদেশের নামটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে বিশ্বক্রিকেট ইতিহাসে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে সেই লাল-সবুজের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর তারুণ্যের হাত ধরে বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে সেই নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করল অনূর্ধ্ব উনিশের যুব ক্রিকেটাররা। আইসিসি পরিচালিত কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো আমাদের বাংলাদেশ। ক্রিকেট বিশ্বে পরাশক্তি ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে যুবা টাইগারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সেই গৌরব অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে হয়তো অনেকে বলতে পারেন এটি তো ক্রিকেটের মূলপর্বের বিশ্বকাপ নয়। অনূর্ধ্ব উনিশের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ। যুব বিশ্বকাপ জয়। তবু বিশ্বজয়ই তো বটে। এর আগে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতেছিল বাংলাদেশ। সেটাই ছিল ক্রিকেটে প্রথম বড় সাফল্য। কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠ যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বরাবরের মতো জায়গা করে নিয়েছে, তেমনই আজীবন খোদাই হয়ে থাকবে পোচেস্ট্রুমে সেনওয়েস পার্কের নামও।

শুধু ক্রিকেটের সীমানাতে আটকে থাকা কেন, যেকোনো খেলাতেই তো প্রথম বিশ্বজয়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে উৎসবের দেশ হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। ২৩ বছর আগে আইসিসি ট্রফি জেতার সময় রাস্তায় মানুষের ঢল নেমে এসেছিল। এবারও সে রকম বাধভাঙা উচ্ছ্বাস ও মিছিলে টাইগার যুবাদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র জয়ের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তে মোটেও সময় নেয়নি। রকিবুলের ব্যাট থেকে জয়ের রানটি আসার পরেই ঘরে-ঘরে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে জয়ধ্বনি উঠতে থাকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে যেকোনো সাফল্য উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে তরুণ প্রজন্মের উল্লাস, সোশ্যাল মিডিয়ায় আকবর আলীকে অভিনন্দনের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া সব মিলিয়ে স্বপ্নপূরণের রামধনু রঙ তৈরি হয়।

যা দেখেশুনে মনে হচ্ছে, উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দিয়েছে মহানাটকীয় ফাইনাল। পেন্ডুলামের মতো দুলেছে দু’দলের ভাগ্য। আর নাছোড় ভঙ্গিতে লড়াই করে ম্যাচ বেড় করে নিয়ে আসা গেছে বলেই হয়তো উৎসবের আমেজ আরো বেশি উপভোগ করা গেছে। পরাক্রমশালী ভারতকে মাত্র ১৭৭ রানে শেষ করে দেওয়া যাবে, কে ভেবেছিল! তার পরেও তো একটা সময় রবি বিষ্ণেইয়ের বিষাক্ত গুগলিতে সব শেষ হতে বসেছিল! বাংলাদেশ চলে গিয়েছিল খাদের কিনারায়। কিন্তু বাংলাদেশের একজন আকবর আলী ছিলেন। তিনিই ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন দলকে। ক্রিজে যাঁর স্থিতধি, নিষ্পন্দ উপস্থিতি দেখে একবারও হতাশ হয়নি, ‘পথিক তুমি কি পথ হারিয়েছ?’ যেন প্রশ্ন নয়, উত্তর সঙ্গে নিয়ে ক্রিজে এসেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে অপরাজিত ৪৩ রানের এই ইনিংস খেলে প্রিয় বাংলাদেশকে বিশ্বজয়ের স্বাদ দিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন নিজের নামের সার্থকতা আকবর শ্রেষ্ঠ।

এ দিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারির রাত শেষে ১০ ফেব্রুয়ারি সকালে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো উচ্ছ্বসিত শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে। একটি সংবাদপত্র লিখেছে, ‘আকবর দ্য গ্রেট’। হয়তো সেটাই বাংলাদেশের অধিনায়কের লড়াইকে সম্মান জানানোর উপায়। সেই আকবর আলী, যিনি টুর্নামেন্টের মাঝপথে তার প্রিয় বড় বোনের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে ওই একটিই মাত্র বোন ছিল। সবার ছোট আকবরের প্রতিই সবচেয়ে স্নেহপ্রবণ ছিলেন যিনি। যমজ সন্তানের জন্ম দিয়ে সেই বোন হারিয়ে গেলেন চিরতরে। আকবরের পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, ছেলে দূর দেশে গেছে দেশের স্বপ্নপূরণ করতে, তাই এমন মর্মান্তিক দুঃসংবাদ এখন তাকে না- দেওয়াই ঠিক হবে। কিন্তু আকবর কীভাবে যেন ঠিক জেনে যান। বাড়িতে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুযোগ করেন, কেন তোমরা আমাকে খবর দাওনি?

চোখ মুছতে মুছতে তখনই কি আকবর প্রতিজ্ঞা সেরে নিয়েছিলেন নিজের মধ্যে যে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বোনের জন্য বিশ্বজয়ের ট্রফি নিয়ে ফিরব? গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে সেনওয়েস পার্কের নৈশালোকে জ্বলজ্বল করছিল আকবরের সেই প্রতিজ্ঞা। মনে করিয়ে দিচ্ছিল বাবাকে হারিয়েও বুকের ভিতরে কান্না চেপে বিশ্বকাপে সচিন টেন্ডুলকারের সেই ব্রিস্টল সেঞ্চুরির কথা। রঞ্জি ট্রফির মাঝে বাবাকে হারিয়ে খেলা চালিয়ে গিয়ে দিল্লিকে বাঁচিয়েছিলেন বিরাট কোহলি। এ বার ক্রিকেটের লোকগাথায় ঢুকে পড়ল যোদ্ধা আকবরের লড়াইও।

এতটা মর্মস্পর্শী না হলেও আকবরের সতীর্থদের জীবনেও কোনো না কোনো কাহিনী রয়েছে। কেউ উঠে এসেছেন অজপাড়া-গাঁ থেকে, কারো সংসারে হাতে ধরা ব্যাটই হলো সোনার হরিণ। বাংলাদেশের এই অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বজয়ও এক দিনে সম্ভব হয়নি। প্রায় দু’বছরের সাধনার ফল এই জয়। ফাইনালের আগের দিন আইসিসি ওয়েবসাইটকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ওপেনার প্রান্তিক নওরোজ নাবিল। বিশ্বকাপে একটাও ম্যাচ খেলেননি। কিন্তু তা নিয়ে হতাশার কোনো ছাপই ছিল না তার চোখেমুখে। এই তরুণ ছেলেরা যে ‘সবার আগে দল’ মন্ত্রে দীক্ষিত। এর আগে আর কোনো বাংলাদেশ দল কখনো এতটা প্রস্তুতি নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি। সঠিক প্রস্তুতিই যে সাফল্যের চাবিকাঠি, সেই শিক্ষালাভ করাটা ট্রফির মতোই এক বড় প্রাপ্তি। ফাইনালে ভারতকে হারানো নিঃসন্দেহে বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে। আর তার কারণ খুব সহজ। বড়দের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার যে রকম ইতিহাস, যুব বিশ্বকাপে ভারতও তেমনই এক মহাশক্তি। চার বারের চ্যাম্পিয়ন, দু’বারের রানার্স। এবার নিয়ে টানা তিনবার ফাইনাল খেলল। গত কয়েক বছর বড়দের ক্রিকেটে ভারত বনাম বাংলাদেশ নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম। তার আঁচ গত ৯ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশ-ভারত যুব ফাইনালেও দেখা গেছে। খেলা শেষে অনাকাক্সিক্ষত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশের খেলেয়াড়রা।

কিন্তু সেই সময়েও শান্ত, ধীরস্থির ছিলেন বাংলাদেশের তারুণ্যের ক্রিকেট নক্ষত্র নামের একজনকে। ক্রিজের মতো বিশ্বজয়ের আনন্দের মধ্যেও যিনি নিয়ন্ত্রণ হারাননি। আর তিনি হলেন বাংলাদেশের যুব ক্রিকেটের অধিনায়ক ‘আকবর আলী’। সত্যিই ‘আকবর দ্য গ্রেট!’

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD