হাসান বুক হাউজ (প্রকাশনী),অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী রচিত “ইতিহাসতত্ত্ব” শিরোনামে একটি মৌলিক পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেছে। ইতিহাসতত্ত্ব ইতিহাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় একটি জটিল এবং দুর্বোধ্য বিষয়। কারণ, এর বিষয়বস্তুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসশাস্ত্রের ওপর প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত ইতিহাসবিদ, দার্শনিক, সমাজতত্ত্ববিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, মানবতত্ত্ববিদ সহ বিভিন্ন বিষয়ে যারা মানব ইতিহাস, সমাজ ও চিন্তনের জটিল নানা পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক সূত্র ও নিয়মাবলীর ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাদের মৌলিক অবদান রেখে গেছেন-সেসবই এই বিষয়ের অপরিহার্য পাঠ্যসূচি হিসেবে বিবেচিত। সেকারণে ইতিহাস যেখানে সমাজ, মানুষ ও সভ্যতার বিকাশের অন্যতম পাঠ্যশাস্ত্র, যা যুগ যুগ ধরে বর্ণনা ও ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সেখানে ইতিহাসতত্ত্ব ইতিহাসশাস্ত্রকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা,পড়া, গবেষণা করা সহ বাস্তব জীবনে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু দীর্ঘদিন ইতিহাসকে অনেকেই রাজা ও শাসকদের জীবনবৃত্তান্তের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতো।
১৯-২০ শতক থেকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ইতিহাসে জায়গা করে নিতে থাকে মানবসমাজ ও সভ্যতার বিকাশের নানা জটিল নিয়ম এবং প্রক্রিয়ার পদ্ধতিতত্ত্ব। এর ফলে ইতিহাসশাস্ত্রই অন্যতম প্রধান মানব ইতিহাসের দর্শন এবং দর্পণ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ইতিহাসতত্ত্ব ও ইতিহাসশাস্ত্রকে এই মান্যতা অর্জনের উপায়সমূহ পঠনপাঠনের মাধ্যমে ধারণ করতে সুযোগ করে দিয়েছে। ২০ শতক থেকেই ইতিহাসতত্ত্ব ইতিহাসশাস্ত্রের পরম নির্ভরশীল অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুতরাং ইতিহাসতত্ত্ববিহীন ইতিহাস কোনভাবেই বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে পঠনপাঠনের কোনো সুযোগ নেই এমনটিই উন্নত বিশ্বে ইতিহাস পঠনপাঠনে লক্ষ্য করা যায়।

আমাদের দেশেও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্নভাবে ইতিহাসতত্ত্বকে ইতিহাসের অন্যতম আবশ্যক পত্র হিসেবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে মানসম্মত মৌলিক উচ্চতর পাঠ্যবইয়ের অভাবের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ ইতিহাসের নান্দনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার উপযোগিতা লাভ করতে পারছে না। কিছু কিছু বই পুস্তক লেখা হলেও এখনো পর্যন্ত ইতিহাসতত্ত্বের মৌলিক ধারণাকে ইতিহাস শিক্ষায় প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারছে না। তবে দেশের ইতিহাস শিক্ষায় ইতিহাসতত্ত্বের গুরুত্ব কেউ এরিয়ে যেতে পারছেন না। ইতিহাসের তত্ত্বীয় বিষয়গুলো সেকারণে অনেকের কাছে জটিল বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞগণ এর ওপর যতবেশি পড়াশোনা এবং গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাবেন ততবেশি ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিকভাবে পঠনপাঠনে আমরা জায়গা করে নিতে পারবো এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রফেসর মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী তার দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন, পাঠদানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই গ্রন্থটি রচনা করেছেন। এতে প্রাচীনযুগের গ্রিস রোম, মধ্যপ্রাচ্য, ভারতবর্ষ ও চীনে যেসব ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক মানব ইতিহাসের নানা জটিল ঘটনাবলী এবং বিকাশের নিয়মাবলী নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন , সেখান থেকে মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ এবং সাম্প্রতিককালের কিংবদন্তীর দার্শনিক ইতিহাসবিদ, সমাজতত্ত্ববিদসহ যারাই মৌলিক চিন্তার অবতারণা করেছেন।
লেখক বইটি শেষ করেছেন বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বরূপ অন্বেষণের মাধ্যমে। গ্রন্থটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং মানব ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের অনুসন্ধিৎসু মনের অনেক খোরাক যোগাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর বেশ কিছু বই স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পঠিত হচ্ছে। এই বইটিও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী মৌলিক পাঠ্যবই বলে বিবেচিত ।
ইতিহাসতত্ত্ব বইটি প্রকাশ সম্পর্কে অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ইতিহাসের সঙ্গে আমার বসবাস ৫০ বছর। ছাত্র জীবন থেকে ইতিহাস জানা, বোঝা,শেখা,অধ্যাপনা, গবেষণা এবং লেখালেখি ছিলো আমার নিত্য দিনের সাথী। ইতিহাসের সব চাইতে দুর্বোধ্য পত্রটি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিহাসতত্ব বলে শুনি। আমার কাছে অবশ্য এই দুর্বোধ্য বিষয়টি বেশ আনন্দের ছিলো। অধ্যাপনা জীবনে এ-ই বিষয়টি আমি দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। শিক্ষার্থীরা লেকচার শুনতে আগ্রহী থাকলেও নির্ভর করার মতো বই সামনে ছিলোনা। বিষয়টি উপলব্ধি করেই ইতিহাসতত্বের উপর একটা বই লেখার প্রস্ততি গ্রহণ করি।
ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ২৫শে জানুয়ারি ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার মনতলা গ্রামে। ছাত্রজীবনে বরাবরই কৃতী ছাত্র ছিলেন। মস্কো গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স এবং ইউএসএসআর অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স-এর ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৮৫ সালে ইতিহাস তত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ওই বছরই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে আসছেন। ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজনী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে ইতিহাস চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশে ইতিহাস পঠনপাঠন, মধ্যযুগ ও আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষানীতি ইত্যাদি।