শিরোনাম :
টেকসই প্রবৃদ্ধিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতার নতুন দিকনির্দেশনা ২৮তম শাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামল রেলওয়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, পাঁচ বছরে ২৪ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে ইতিহাস গড়লেন মেসি, অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে অভিযোগ: ঢাবির তিন শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত, আরও দুজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সুরের মিলনমেলা, দুই দিনের আয়োজন শেষ করল সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ ফ্রান্সে রেকর্ড দাবদাহে দুই দিনে প্রাণ গেল ১৮ জনের নতুন এল নিনোর প্রভাবে বিপর্যয়ের আশঙ্কা, উষ্ণ হতে পারে ২০২৭ সাল সাড়ে তিন মাস পর হরমুজ প্রণালি পেরোল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় জয়, নকআউট নিশ্চিত করল নরওয়ে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে-‘নুর-উন-নাহার মেরী’-এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

মশিউর আনন্দ:
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০২৩

নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, স্বাধীনতা, প্রাপ্য অধিকার আদায়ে সংগ্রাম ও নারীর আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ‘জাগো নারী ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নূর-উন-নাহার মেরী যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জন্ম জামলপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলাধীন গুনারিতলা গ্রামে (নানা বাড়ি)।

তিনি বাবর চাকরি সূত্রে পাকিস্তানে ৪ বছর বয়সে করাচি শহরে পাড়ি দেন। করাচি শহরে একটি মিশনারী স্কুলে ( ম্যাথডিস প্রাইমারি স্কুল ফর আমেরিকান) তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি শুরু হয়।

নূর-উন-নাহার মেরী ১৯৬৬-৬৭ সালে করাচী বাংলা বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সংগঠিত ছাত্রলীগ করাচী শাখার নির্বাহী সদস্য মনোনীত হন। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে পশ্চিমাদের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে তাঁর নেতৃত্ব করাচির রাজপথে নগ্ন পায়ে প্রভাত ফেরির নেতৃত্ব দেন। যা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সাক্ষী ।

তখন থেকেই তার মধ্যে বিপ্লবী নারী সত্ত্বার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে কর্মজীবনে এসেও তার এই বিপ্লবী চেতনা আরো অধিকতর শানিত হতে দেখা যায়। ১৯৭৪ সাল হতে ১৯৮৪ ইং সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন এমপ্লোয়িজ ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নুর-উন-নাহার মেরী ৭৪ হতে ৮৪ সাল একটানা ১০ বৎসর বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে ডাক সাইটে শ্রমিক নেত্রী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৮১ সনে আগষ্ট মাসে শ্রমিক নেত্রী হিসাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণে ‘হিউম্যান রিসোর্সেস ইউটিলাইজেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট’-বিষয়ের উপর নিউইয়র্কের কর্ণেল ইউনিভার্সিটি থেকে হায়ার লেবার লীডারশীপের (ট্রেড ইউনিয়ন ডিপ্লোমা) উপর উচ্চ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেই থেকে বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নূর-উন নাহার মেরীর আরো একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স সমাপনি দিবসে প্রত্যেক দেশের একজন করে প্রতিনিধি বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নূর-উন নাহার মেরী বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্হিতির উপর জোরালো বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধিগণ প্রায় ১৫ মিনিট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশ্নবানে তাকে জর্জরিত করে কিন্তু উনি প্রচন্ড সাহসিকতার সাথে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক ও যৌক্তিক উত্তরে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ শেষে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ‘ভয়েস অব আমেরিকায়’ ইকবাল বাহার চৌধুরী কর্তৃক ৪০ মিনিটের তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন যা পৃথিবী ব্যাপি সম্প্রচারিত হয়।

এছাড়াও পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বাংলা টিভি ও একুশের টিভি লন্ডন স্টুডিও থেকে একজন বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন।

নরওয়েতে থাকাকালীন সময়ে আসলো টিভি ও রেডিওতে বাংলাদেশ নারীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের উপর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার প্রদান করে বাংলাদেশের সম্মান বৃদ্ধি করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ‘অফিস ম্যানেজমেন্ট কমিউনিকেশন’ থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জনের করেন।

তিনি ১৯৮৪ সালে ইউএসএইড ও ফিলিপাইন সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় ম্যানিলার ‘ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনে’ জেনারেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স ফর ওমেন একজিকিউটিভ এর উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যা বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে অনন্য। মেধা ও মননে তিনি বাংলাদেশের নারী সমাজকে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একইভাবে উল্লেখিত বিষয়ে অধ্যায়নকালে বিভিন্ন আর্ন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য রেখে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করেন।

অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ নরওয়ের ওসলো ইউনির্ভার্সিটি ও নরোয়েজিয়েন শিপিং একাডেমীর যৌথ ব্যবস্থাপনায় ১৯৯০ সনে ‘শিপিং ম্যানেজমেন্টে’ স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে নূর-উন-নাহার মেরী ইউরোপ পাড়ি জমান।

১৯৯০ সালে নরওয়ের ওসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেসিক কোর্স শুরু হওয়ার পূর্বে ১৫ দিনের অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের শেষ দিনে পৃথিবীর বিভীন্ন দেশ থেকে প্রায় ৬০ জন অংশগ্রহণ করে। তাঁদের মধ্যে শুধুমাত্র একজনকে বক্তব্য রাখার সুযোগ প্রদান হয়। কে বক্তব্য রাখতে আগ্রহী তাকে হাত তুলতে বলা হয়।ঘোষণা প্রদানের সাথে সাথে বিদ্যুৎ গতিতে প্রথমেই হাত উচুঁ করে সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং একমাত্র বক্তা হিসেবে কথা বলার সুযোগ পান।

প্রায় ২৫ মিনিট বক্তব্যের (ইংরেজী ভাষায়) মূলবিষয় ছিল কেনো উচ্চশিক্ষা বা ডিপ্লোমা বা সাধারণ বৈদেশিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে বিমাতা সুলভ আচারন করা হয়ে থাকে!
যার ফলোশ্রুতিতে বাংলাদেশের নারীদের মেধা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সমযোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্বেও নারীরা বৈদেশিক প্রশিক্ষণে শতকরা ২ ভাগ সুযোগ পায় না।
তাঁছাড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক রীতিনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ করে নারীদের আত্মউন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নারী অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

বক্তব্যে শেষ হওয়া মাত্রই নরাড প্রতিনিধি (মহিলা) নূর-উন-নাহার মেরীকে জডিয়ে ধরে বলেছিলেন- Are you Associated with any Political Party? প্রশ্নটা শুনামাত্র তিনি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন বৈকি, তবে তাৎক্ষনিক জোর গলায় উত্তর দিয়েছিলেন, -No mam , I am not associated with any Political Party.উত্তরে নরাড প্রতিনিধি বলেছিলেন, But do You know that , you spoke like a real Politician! সেই ১৯৯০-এর পর থেকে আজ বাংলাদেশের নারীরা এর সু-ফল পেয়ে আসছে। যা বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য গর্বের।

নিউইয়র্কের কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ডিপ্লোমা অন হাইয়ার লেভেল লিডারশিপ’ সমাপ্ত করেন ও ‘লেটার অব এ্যাসিভমেন্ট’ অর্জন করেন। পাশাপাশি লন্ডনে ‘লয়েড ইন্সুরেন্স কোম্পানি’ থেকে সনদ লাভ করেন। প্রশিক্ষণ,শিক্ষা ও উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, নেপাল, থাইল্যান্ড, হংকং, চায়না, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে গমন করেন।

নুর-উন-নাহার মেরী বঙ্গবন্ধু মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা সংস্কৃতি পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেডিডেন্ট। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এর সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক।২০০৩ সনে তৎকালীন রাজনৈতিক রোসানলে পড়ে বাধ্যতামুলক অবসরে যেতে হয়। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতা স্ব-পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও তাঁকে কোনো ক্ষতিপূরণ বা পুন:র্বহাল করা হয়নি।বিষয়টি সত্যিই অপ্রত্যাশিত।

১৯৯৫ সালে মার্চ মাসে লন্ডনস্থ ‘গিলবার্ট’ হলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও প্রমিন্যান্ট হাউজিং সোসাইটির যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর আয়োজিত আলোচনা সভা ও ফটো প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংস্থার আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মর্যাদায় আমন্ত্রিত হয়ে প্রধান আলোচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। উক্ত বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা উত্তর পরিস্থিতির উপর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে উপস্থিত ব্রিটিশ, সোমালিয়ান ও ইথিয়পিয়ানসহ অন্যান্য দেশের অতিথিদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই বিষয়ে তখন লন্ডনস্থ বাংলা পত্র-পত্রিকায় ছবিসহ বিশেষ সংবাদ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে তাঁর সেদিনের বক্তব্য সত্যিই অসাধারণ আর অহংকার প্রকাশ করেছিলেন অগণিত শ্রোতা।

১৯৯৫ সালের ১৮ই মার্চ হোয়াইট চেপেল রোডে ‘লন্ডন-ই-ওয়ানে’ কালচারাল শেয়ারিং প্রোগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ওয়ার্কশপে বাংলাদেশের একমাত্র আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হয়ে ‘বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতির অঙ্গনে নারী সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহন করেন। আলোচনায় বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস, বিশ্ব সাহিত্যে বাঙালির অবদান ও বাঙালি সংস্কৃতির নানান দিক নান্দনিক ভাবে উপস্থাপন করেন।

তিনি ২০০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘লন্ডন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ’ কর্তৃক আয়োজিত বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। যেখানে ৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকারের সমালোচনা,১৯৭০-এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরেন।

জাগো নারী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চেয়ারপার্সন হিসাবে তিনি তাঁর বাবার আর্দশ ও জীবন দর্শনের আলোকে সমাজের নিপীড়িত, অবহেলিত ও নির্যাতিত নারী সমাজ ও হতদরিদ্র দুঃখী মানুষের কল্যাণে আত্মনিবেদন করে চলেছেন।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD