জার্মানবাংলা অনলাইন: মহান বিজয় দিবস আজ। বিজয়ের দিন। আজ লাল-সবুজের পতাকার লড়াইয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৮তম মহান বিজয় দিবস। একাত্তর সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই দিনে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে বিজয়ের লাল সূর্য। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘদিনের শোষণ আর বঞ্চনার। বিজয়ের ৪৮তম বার্ষিকীতে আজ পুরো জাতি পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় উৎসবমুখর পরিবেশে স্মরণ করছে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী লাখো শহীদকে। যাদের জীবন উৎসর্গে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তির স্বাদ নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার এ দিনে লাল সবুজের উৎসবে উদ্বেলিত আজ জাতি। সর্বত্র উচ্চারিত জয়গান সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথ।
বিজয়ের ৪৮ বছর পেরিয়ে এবার ৪৯তম বিজয় দিবস। এবারের বিজয় দিবস এসেছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং এর পরের বছর ২০২১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছরে অনেক অর্জন-সাফল্য আছে। রয়ে গেছে অনেক অপ্রাপ্তিও। এখনো একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সামনে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যের অবসান ঘটানোই হওয়া উচিত বিজয় দিবসের শপথ। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পালিত হচ্ছে এসব কর্মসূচি। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
আজ প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসটির সূচনা হয়েছে । দিবসটি উপলক্ষে সকালে সারা দেশের সব সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে । বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। আজ ভোরে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পর্যায়ক্রমে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন । সকাল থেকে শুরু হয় পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরস্থ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করেন । প্রধানমন্ত্রীও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ।
বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় করা হয়েছে আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হবে। সংবাদপত্র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে, বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আওয়ামী লীগের দুইদিনক্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়াও আজ টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠান। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ১৭ই ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভ অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম জেগে উঠে ৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। ফাগুনের আগুনে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উন্মাতাল গণমানুষেল মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায় সেদিন। ভাষার জন্য প্রথম বলীদান বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে। সেই থেকে শুরু বাঙালীর শেকল ভাঙার লড়াই। পলাশীর আম্রকাননে হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার লাল সূর্য আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত হয়ে দেখা দেয় বাংলার আকাশে। বাষট্টি, ঊনসত্তর এবং ’৭০ এর পথ ধরে উত্তাল একাত্তরে বাঙালি চিরতরে পরাধীনতার শেকল মুক্তির গান রচনা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ৭ই মার্চ একাত্তরের বিশাল জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব, তবুও এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় মুক্তির সংগ্রাম। ২৫শে মার্চ ঘুমন্ত জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। শুরু হয় বাঙালী নিধন যজ্ঞ। মুক্তি পাগল বাংলার দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার রক্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে বলে একদিন অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয়। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, কামার কুমার সবাই শরিক হয় মুক্তির এ লড়াইয়ে। ডিসেম্বর শেষ পর্যায়ে এসে চূড়ান্ত রূপ নেয় মুক্তির সংগ্রাম। অবশেষে ন’মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে আসে স্বপ্নের প্রভাত। ১৬ই ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। বিজয়ের সোনালী দিন।