আরিফুজ্জামান আরিফ, বেনাপোল প্রতিনিধি: চৌগাছার বুকচিরে বয়ে চলা মহাকবি মাইকেল মধুসুধন দত্তের কপোতাক্ষ নদে পলি জমেও অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে প্রায় মরতে বসেছে।
বর্ষার ভরা মৌসুমেও নদে নেই কোন স্রোত। বৃষ্টিতে নদের পানি বাড়লেও স্রোত না থাকায় পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একই সাথে স্রোত না থাকায় কপোতাক্ষের বিশাল এলাকা জুড়ে পট কচুরিপনায় ভরে গেছে। এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে কপোতাক্ষের মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী মরে শেষ হয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন এলাকাবাসি।
জানা যায়, চৌগাছা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদ এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে এক সময়ের খরস্রোতা নদের এই বেহালদশা বলে মনে করছে এ জনপদের সচেতন মহল। বর্তমানে বর্ষার ভরা মৌসুমে নদে পানি বাড়লেও নেই কোন স্রোত। গোটা নদটি ভরে গেছে পট কচুরিতে। এছাড়া নদে মাঝে মাঝে পাটাতন দেয়ায় এই পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে এক শ্রেনীর অসাধু ব্যক্তি নদের জমি দখল করে নিয়ে নিজের মত করে ব্যবহার করায় নদ হয়ে গেছে সংকুচিত। বৃষ্টিতে নদে ঠিকই পানি বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু কোন স্রোত না থাকায় নদের পানি নষ্ট হচ্ছে। এরসাথে যোগ হয়েছে বাজারের পোল্ট্রি মুরগী ব্যবসায়ীদের মুরগীর নাড়ি ভুড়ি বস্তা বন্ধি করে নদে ফেলে রাখা। বৃষ্টিতে পানি বেড়ে ঘাস লতা পাতা পচে নষ্ট হচ্ছে পানি, অন্যদিকে মুরগীর এইসব নাড়ি ভুড়ি পচে নষ্ট পানি হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে কপোতাক্ষের পানিতে থাকা সব ধরণের জলজ প্রাণীর এখন প্রাণে বেঁচে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে কপোতাক্ষের বুকে সব ধরণের মাছ ও কীট পতঙ্গ পানির উপর ভাসতে শূরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে নদে স্রোত না থাকায় পট কচুরি ও মুরগীর নাড়ি ভুড়ি পচে পানি নষ্ট হয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়ায় মাছসহ সব প্রকার জলজ প্রাণী বেশ কিছু স্থানে পানির উপর ভেসে উঠছে।
নদ পাড়ের বাসিন্দারা জানান, দেশ স্বাধীনের পরও এই কপোতাক্ষ নদে নিয়মিত জোয়ার ভাটা আসত। পাল তোলা নৌকা নিয়ে মাঝি মনের সুখে গান গাইতে গাইতে নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতো। ভরা যৌবনের কপোতাক্ষের অঢেল পানি আর জীব বৈচিত্র এ অঞ্চলে এক অপরুপ সৌন্দর্য বিরাজ করত। সে সময়ে কপোতাক্ষ নদে দেশী প্রজাতির মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের মাছের ব্যাপক সমারোহ ছিল। নানা জাতের পাখির কিচির মিচির ডাকে মুগ্ধ হতো মানুষ। নদকে কেন্দ্র করে কপোতাক্ষের পাড়ে শতাধিক জেলে পল্লী গড়ে ওঠে। তাদের জীবন জীবীকার এক মাত্র মাধ্যম ছিল কপোতাক্ষ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই কপোতাক্ষ আজ মরাখালে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জীব বৈচিত্রের উপর। বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে কপোতাক্ষ পাড়ে বসবাসরত জেলেরা। তারা কোন উপায়ান্তর না পেয়ে পেশা পরিবর্তন করে আজ অনেকে হয়েছে দিন মজুর, কেউ নাপিত, ভ্যান চালক বা মুদি ব্যবসায়ী আবার অনেকে চলে গেছে অন্যত্র।
অবৈধ দখলদারদের কারণেই কপোতাক্ষ নদের আজ এই পরিস্থিতি বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। বর্ষা মৌসুমে নদের কিছুটা রুপ ফিরে পাই। কিন্তু সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয় না। বৃষ্টি থামার পর কয়েক দিনের মধ্যে পানি সরে আবার ফিরে আসে পূর্বের চেহারায়। আর গ্রীস্ম মৌসুমে তো কপোতাক্ষের বুকে চরে গরু ছাগল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কপোতাক্ষের অসংখ্য জমি চলে গেছে দখলদারদের কবলে। এই জমিতে কেউ তৈরী করছেন পুকুর, আবার অনেকে নদের পাড়ের জমি দখলে নিয়ে তৈরী করছে বসতবাড়ি। এসব বাড়িঘর তারা নিন্মবিত্তদের মাঝে ভাড়া দিয়ে প্রতিমাসে নিয়মিত হারে ভাড়া আদায় করছেন বলেও অভিযোগ। অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে এক সময়ের প্রমত্তা কপোতাক্ষ মুক্ত করার পাশাপশি খনন করে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছে এ জনপদের মানুষ।