দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব এবং বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ তহবিল। পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে চলমান আইনি কার্যক্রমের অগ্রগতি হিসেবে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব-সম্পর্কিত কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। কমিটির সভাপতির অনুপস্থিতিতে সদস্য ইকরামুল বারী টিপুর সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘বাংলাদেশের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগসমূহের সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণের অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর এবং বিদেশে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রমের প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋণখেলাপির পরিমাণ, গোয়েন্দা তথ্য ও সংগৃহীত প্রমাণ, অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে ঋণ গ্রহণ এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সম্পদের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য এসব ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীকে নির্বাচন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের পরিমাণ এবং বিদেশে সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৪০টি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আদালতের আদেশের আওতায় থাকা সম্পদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া সম্পদের মূল্য ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মতো সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, বিও হিসাবসহ বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দেশের বাইরে থাকা সম্পদের মধ্যে আদালতের আদেশের আওতায় এসেছে প্রায় ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের মূল্য ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। দেশীয় ও বিদেশি সম্পদ মিলিয়ে আদালতের আদেশের আওতাধীন সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে ‘অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ (এআরটিএফ)। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, শনাক্তকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তা পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সম্পদ পুনরুদ্ধার-সংশ্লিষ্ট ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং স্থানীয় আদালতে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মামলাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাচার হওয়া সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে ১৫৮ জনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে ১০টি রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের লক্ষ্যে ১৬টি বিচারিক এখতিয়ারের কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) সম্পন্ন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পদ পুনরুদ্ধারের সহযোগিতা জোরদার করতে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) স্টার ইনিশিয়েটিভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সঙ্গেও যোগাযোগ ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের মালিকানা, অবস্থান ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহে এসব আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আটটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংককে ছয়টি কনসোর্টিয়ামের লিড ব্যাংক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এসব ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে সম্পদ শনাক্ত, আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ইতোমধ্যে ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজও শুরু করেছে। কনসোর্টিয়ামভিত্তিক এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টা সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আদালতের আদেশের আওতায় থাকা সম্পদগুলোর প্রকৃত মালিকানা যাচাই, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার ওপর সম্পদ পুনরুদ্ধারের পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে।
সূত্র: সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত ‘বাংলাদেশের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগসমূহের সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক প্রতিবেদন ও সরবরাহকৃত তথ্য।