উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং বহুমুখী রপ্তানি কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার ঢাকার বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
ড. তিতুমীর বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে—অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ।
তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি একক পণ্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্য রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি।
আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান অবস্থান থেকে উন্নতি করতে হলে গবেষণা, বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ এবং প্রযুক্তির ধারাবাহিক অগ্রগতির বিকল্প নেই। তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তবাজার শিল্পনীতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেশের পোশাক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান তিনি।
উদ্ভাবক ও গবেষকদের উৎসাহিত করতে নীতিগত ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দেন ড. তিতুমীর। মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ‘রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বেসরকারি খাত বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ তহবিলে অবদান রাখলে সরকার কর ছাড়সহ প্রয়োজনীয় রাজস্ব সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতার বিস্তার এবং তরুণ উদ্ভাবকদের নেতৃত্বে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি ও মেধার বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, তরুণদের নতুন উদ্ভাবন ও মেধা বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ‘ইনোভেশন ফেয়ার’ আয়োজন করা হবে।
সচিব বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উদ্ভাবনী চিন্তাকে গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং সফল উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার পথ সুগম করা হচ্ছে। মেলায় প্রদর্শিত কিছু উদ্ভাবন ইতোমধ্যে বাজারে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে এবং ওমানসহ বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, গত তিন দিনে মেলায় ২০টি অ্যাকাডেমিক, মিডিয়া ও পলিসি সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৬৭১টি আবেদনের মধ্য থেকে দক্ষ প্যানেলের মূল্যায়ন ও বাছাইয়ের মাধ্যমে ৫০টি সেরা নিবন্ধিত উদ্ভাবনী দলকে মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
বিচারক প্যানেলের সিদ্ধান্তে নির্বাচিত শীর্ষ ১০ উদ্ভাবনী দল হলো—হোমপিটাল নেক্সাস, স্মার্ট হুইলচেয়ার, ফায়ারফ্লাই, ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস, বিডি সাইবার হেল্পলাইন, ওয়াটার রিপেলেন্ট জুট ফেব্রিক, ন্যাচারাল ফাইবার পিসিবি, অ্যানটেনা ফর ন্যানোস্যাট, লিকুইড ট্রি এবং সেলফ কন্টাক্টর। প্রত্যেক বিজয়ীকে এক লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সফল ও সক্রিয় উপস্থাপনার জন্য গাজী এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি, যশোর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বিইউবিটি, খুলনা ইউনিভার্সিটি এবং এআইইউবিকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।
মেলায় ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক স্টল ছিল। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, শিল্প উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং তরুণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।