গত ৩ মার্চ শ্রীলঙ্কার নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায় দেশে ফেরার পথে ইরানি যুদ্ধজাহাজ “আইআরআইএস ডেনা” মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলার শিকার হয়। হামলায় “ডেনা” ডুবে যায় এবং জাহাজে থাকা ৮০ জনেরও বেশি নাবিক প্রাণ হারান।
খবরটি প্রথম দেখার সময় আমার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লেগেছিল—কেন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ শ্রীলঙ্কার কাছে মার্কিন সাবমেরিনের শিকার হলো? পরে খবর ঘেঁটে জানতে পারলাম, ইরানি এই যুদ্ধজাহাজটি মূলত ভারতের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিল। তারা ভারতীয় নৌবাহিনীর দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল: একটি হলো “মিলান” নামক বহুজাতিক নৌ-মহড়া ও সম্মিলিত অনুষ্ঠান এবং অন্যটি ছিল ‘২০২৬ ভারতের আন্তর্জাতিক নৌবহর পরিদর্শন’ অনুষ্ঠান। “মিলান” যৌথ মহড়ার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানি নৌবাহিনীর একটি সামরিক ব্যান্ড দল ওই অনুষ্ঠানের কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সেই ব্যান্ড দলের অনেক সদস্যই আজ সমুদ্রগর্ভে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছেন।
অনেক ভারতীয় অনলাইনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী মূলত “ভারতের অতিথিদের” শিকার করেছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনমোহন বাহাদুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, মার্কিন বাহিনীর এই কাজ “পুরোপুরি পাগলামি ও চরম অনৈতিক।” তিনি আরও বলেন, “ইরানের এই নাবিকরা একটি শান্তি মহড়ায় অংশ নিতে এসেছিলেন, তাঁদের জাহাজে হয়তো কোনো অস্ত্রও ছিল না।”
একবার ভেবে দেখুন, “ডেনা” জাহাজের নাবিকদের বাড়ি ফেরার পথে মানসিক অবস্থা কেমন ছিল! তাঁরা যখন ভারতে আমন্ত্রিত হয়ে আসছিলেন, তখন ইরান শান্তিতে ছিল; কিন্তু যখন তাঁরা অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছিল। কিন্তু তারপরও তাঁদের বাড়ি ফিরতেই হতো। যদিও তাঁরা জানতেন যে, ইরানের অনেক যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে, এবং তাঁদের জাহাজে হয়তো আত্মরক্ষার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্রও ছিল না।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে নির্দ্বিধায় এই সামরিক অভিযানের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে শ্রীলঙ্কার উপকূলের নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো নিক্ষেপ করে নির্ভুলভাবে ইরানি যুদ্ধজাহাজ “ডেনা”-কে ধ্বংস করা হয়েছে। হেগসেথ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “তারা ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ, কিন্তু তারা নিঃশব্দে মৃত্যুবরণ করেছে।”
মার্কিন পক্ষ টর্পেডো আঘাত হানার একটি সাদা-কালো ছবিও প্রকাশ করেছে, যেখানে আঘাতের ফলে সমুদ্রের বুকে বিশাল জলস্তম্ভ উঠতে দেখা যায়। মার্কিন পক্ষের দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই প্রথমবারের মতো মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো নিক্ষেপ করে কোনো “শত্রু জাহাজ” ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ বুধবার পার্লামেন্টে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি জানিয়ে বলেন, “ডেনা” বুধবার ভোরবেলা জরুরি সাহায্য সংকেত (এসওএস) পাঠিয়েছিল। শ্রীলঙ্কা কঠোরভাবে “আন্তর্জাতিক সমুদ্র অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংক্রান্ত সনদ” অনুসরণ করে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার পরিকল্পনা শুরু করে। সংকেত পাওয়ার এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে উদ্ধারকারী জাহাজ দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর গল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।
৫ মার্চ শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ও গলের জাতীয় হাসপাতাল যৌথভাবে নিশ্চিত করে যে, উদ্ধারকারীরা ৮৭ জন ইরানি নাবিকের মরদেহ উদ্ধার করেছে। বর্তমানে জীবিত উদ্ধার হওয়া ৩২ জন ইরানি নাবিক গলের কারাপিতিয়া জাতীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বেদনাহত কণ্ঠে এই ঘটনাকে ‘মার্কিন বর্বরতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ডেনা” ছিল “ভারতীয় নৌবাহিনীর অতিথি”। জাহাজটিতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিলেন শুধু প্রশিক্ষণরত অফিসাররা। ইরানের উপকূল থেকে ২,০০০ মাইলেরও বেশি (প্রায় ৩,২১৮ কিলোমিটার) দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এটি আক্রান্ত হয়।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকা ৫ মার্চ জানান, ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে বন্দরে প্রবেশের অনুরোধ জানানো ইরানি সরবরাহ জাহাজ “আইআরআইএস বুশেহর”-কে গ্রহণের ব্যবস্থা করছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী। জাহাজে থাকা ২০৮ জনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে; পরে জাহাজটি দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিনকোমালি বন্দরে স্থানান্তর করা হবে।
দিশানায়েকা বলেন, শ্রীলঙ্কা তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালন করবে এবং মানবিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা কোনো দেশের পক্ষ নিই না এবং কোনো দেশের চাপেও নতি স্বীকার করি না।”
কয়েকদিন আগেই ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৬০ জনেরও বেশি অসহায় মেয়ে নিহত হয়; আর এর কয়েকদিন পরই একটি অস্ত্রহীন যুদ্ধজাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় টর্পেডো হামলার শিকার হয়ে ৮০ জনেরও বেশি নাবিক সমুদ্রগর্ভে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, এই ধ্বংসযজ্ঞের এখনও কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র: স্বর্ণা-তৌহিদ-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।