আমার মা – লতিফা খাতুন। পেশায় ছিলেন বাগেরহাট জাহানাবাদ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। রিটায়ারমেন্টের পর অবসর জীবনযাপন করছিলেন। আমার বাবা শহরের একজন পুরাতন ব্যবসায়ী। আমাদের প্রিন্টিং প্রেসের নাম ছিল মুকুল প্রিন্টিং প্রেস। মুকুল আমার একমাত্র ভাইয়ের নাম। ২০০৫ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে পাড়ি জমায় অন্য ভূবনে। সেই কষ্ট বুকে চেপে আমাদের ০৩ বোনকে আকড়ে ধরে আব্বা বেচে ছিলেন ২০১২ সাল পর্যন্ত। ঠিক তার পরই মা-কে বুকে করে নিয়ে আসি আমার কাছে। আমি রুখসানা বেগম। বাবা-মায়ের অতি আদরের এবং অতি আস্থার শিমু। ভাইবোনদের মধ্যে আমি সবার ছোট। পেশায় বেসরকারী উনড়বয়ন সংস্থার একজন উনড়বয়নকর্মী। আমার বাকী ০২ বোনদের মধ্যে বড়বোন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক এবং মেজবোন পল্লীবিদ্যুত সমিতির একজন কর্মকর্তা। মায়ের চাকরী করা এবং বাবার অনুপ্রেরণায় আমরা তিনটা বোনই স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে উঠেছিলাম। মায়ের সমস্ত খরচ আমরা তিনবোন মিলে বহন করেছি। ওরা দুজনই ঢাকার বাইরে থাকে। দুরে থাকলেও আন্তরিকতা এবং দ্বায়িত্ববোধে কোন ঘাটতি ছিলনা কখনই।
আমার মায়ের বয়সের সাথে সাথে সঙ্গী হয়েছিল ডায়বেটিস, উচ্চরক্তচাপ এবং তার প্রভাবে ধীরে নষ্ট হতে থাকল চোখ এবং কিডনী। মা আমার সাথে থাকতে থাকতে সে যে কখন আমার মা থেকে আমার বাচ্চাদের সমতূল্য হয়ে গেল আমার কাছে! চাকরীর পাশাপাশি ০২ বাচ্চা, সংসার, মা কে নিয়ে বিভিনড়ব ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি সবই স্বাভাবিক গতিতে চালাতে আমার কখনোই জীবনকে কঠিন মনে হয়নি। এর একটা বড় কৃতিত্ব আমার বাচ্চাদের এবং তাদেও বাবাকে না দিলেই নয়।
সব ঠিকঠাক চলছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মা হঠাত খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিডনী হাসপাতালে প্রায় ০১ মাস চিকিতসার পর নিয়মিত ডায়ালাইসিস এ চলে যেতে হয়। সপ্তাহে ০২ দিন ডায়ালাইসিস। নতুন পরীক্ষা শুরু হল। মা কে মানসিকভাবে শক্ত রাখার আপ্রান চেষ্টার পাশাপাশি নিজের রুটিনেও আসে অনেক পরিবর্তন। ০১ টা বছর দিব্যি চলছিল। এরপর মায়ের রক্তে সি ভাইরাসের আগমন ঘটল। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার মা কে নিয়ে ছুটে যাই মহাখালী আইসিডিডিআরবি-তে। একই ফলাফল। এবার নিয়ে ছুটলাম ল্যাব এইড হাসপাতালে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে। বিভিনড়ব টেস্ট এর পর জানা গেল আমার মা কে সি ভাইরাস তীব্রভাবে আμমন করেছে। কিছুদিন পর কোমর ব্যথায় একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলল। মা বিছানায় পড়ে গেলেন। দু পায়ে ভর দিয়ে আর দাড়াতে পারলেননা। অর্থোপেডিক ডাক্তার চিকিৎসা দিলেন এবং বললেন সিআরপি তে যোগাযোগ করতে। কিডনী হাসপাতালে ভর্তি করলাম। প্রায় ২ সপ্তাহ পর তারা বললেন, এখানে পেইন ম্যানেজমেন্ট এর কোন ব্যবস্থা নেই – গেলাম সিআরপি তে ওরা বলল এখানে পেইন ম্যানেজমেন্ট পাবেন কিন্তু ডায়ালাইসিস এবং হার্টের সমস্যা আছে এমন রোগীকে তাঁরা ভর্তি করতে পারবেন না। অগত্যা সমণি¦ত চিকিৎসার ব্যবস্থা হাসপাতালে না পেয়ে বাসায় নিয়ে এসে থেরাপীর হোম সার্ভিস এর সাহায্য নিলাম। এই অবস্থায়ই চলতে লাগল ডায়ালাইসিস। হুইল চেয়ার এবং এ্যাম্বুলেন্স হয়ে গেল সঙ্গী। আমার নিজের বাসায় লিফট না থাকার কারনে মাত্র ৩/৪ দিনের মধ্যে লিফটসহ বাসা খুঁজে পেলাম এবং মার্চ ২০২০ এ বাসা পরিবর্তন করলাম যাতে মায়ের ডায়ালাইসিস এ যেতে অসুবিধা না হয়। এটাই যে তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়! মা কে ২ জন শক্তপোক্ত মানুষ ধরে হুইল চেয়ারে বসাতে হতো।
শুরু হলো মায়ের তীব্র শারীরিক কষ্টের সাথে সাথে করোনাকালীন সতর্কতার এক ভয়াবহ সময়। এ্যাম্বুলেন্সে চড়া খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল….. কত রকম রোগী বহন করে এরা। আমার স্বামী এবং আমি এক অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম। যে কোন একজন নিয়ে যাব ডায়ালাইসিস করাতে। বেশীরভাগ সময় সে ই নিয়ে যেত। আসার পর কত রকম সতর্কতা! আমার ছোট ছোট দুটা বাচ্চা আছে। মা কে বাসায় এনে আমার তৎপরতা বেড়ে যায় তার ভীষন নাজুক শরীর পরিষ্কার করে, কাপড় বদলাতে, খাওয়াতে। ডায়ালাইসিস করতে করতে মায়ের ব্রেইন বেশ এলোমেলো তখন। শুধু বলত, আমাকে শুইয়ে দাও… শুইয়ে দাও…আমি আর বসতে পারছিনা বলে চিৎকার করত। এর মধ্যে দিয়েই আমাকে সব করতে হতো। শেষ ডায়ালাইসিস করে আসার পর তার শরীর আর ডায়ালাইসিস নেয়ার মতো অবস্থায় ছিলনা। লকডাউন এর মধ্যেও ডায়ালাইসিস এ নিয়ে যাচ্ছিলাম এর আগ পর্যন্ত। তিনি এক ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। শুধু আমাকে চিনতেন। আমি তাঁর মা। এক মূহুর্তের জন্যও সরে যাওয়া যাবেনা। মা.. মা….. মা….. বলে চিৎকার!!! অথচ আমার স্বল্পভাষী, ভদ্র, বিনয়ী মায়ের কন্ঠস্বর সারাজীবনই ছিল মৃদু। আমাকে সবসময় তাঁর হাত ধরে বসে থাকতে হবে। আমার হাতটা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে নিজের বুকের মধ্যে ধরে রাখলেই তাঁর শান্তি!!! কিডনী হাসপাতালের ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ করলাম। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া দরকার তখন। কিন্তু হাসপাতাল যে তাঁর নাজুক শরীরের জন্য ভীষন বিপদজনক! করোনা যদি তাঁকে বা আমাদের কারো একজনের শরীরে ঢুকে পড়ে তাহলে তো সবার জন্যই বিপদ! কোন সাহায্যকারী নেই তখন আর। আমার বোনরাও আর আসতে পারলনা লকডাউনে। আমার মত অসহায় বোধহয় তখন আর কেউনা!!!! আমি
কোন দিকে যাব??? আমি হলাম আমার মায়ের এই পৃথিবীতে পরম আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গা। তখন মুখে আর কথা বলতে পারতেন কম। আমার দুটা হাত ধরে শুধু ঝাঁকাতো…আমিও সেই ঝাঁকুনিতে দুলতাম আর অসহায়ের মত বলতাম… কি করব মা? বল … আমাকে বল…। এর কিছুদিন আগেও মায়ের এবং আমার ধারণা ছিল, মা ভালো হয়ে যাবে। কতবারইতো অসুস্থ হলো আবার আল্লাহ ভালো করে দিলেন। পরিবারের সবাই হাল ছেড়ে দিলেও আমি মা কে ফিসফিস করে বলতাম “তুমি ভালো হয়ে যাবে, মা… তুমি চেষ্টা করো … মনে জোর আনো, তুমি পারবে”। একদিন আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “ তুমি শিগগির আমাকে ভালো করে দাও”! আবার কাকে যেন বললেন, “আমি এখন যাবোনা, আমি আরো পরে যাব”। আরেকদিন আমার হাত ধরে বললেন, “আমাকে ছেড়ে দাও, মা!”আমি আর সেলিম (আমার হাসবেন্ড) তখন কি ভয়াবহ কিংকর্তব্যবিমূঢ অবস্থায় প্রতিটা মূহুর্ত কাটাচ্ছি। মায়ের পাশে বসে তাঁর মুখে, বুকে, গায়ে হাত বুলিয়ে শুধু বলতাম, “তোমার জন্য আমি কিছু করতে পারছিনা মা, তুমি আমাকে মাফ করে দাও… আর ব্যাকুল হয়ে কাঁদতাম। আল্লাহকে বলতাম, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে এই পরীক্ষায় ফেলেছেন, আমাকে পাশ করানোর দায়িত্বও আপনার। মা তখন ওষুধও আর খেতে পারছেন না। এ অবস্থায়ও তাঁকে প্রতিদিন শোয়া অবস্থায় গোসল করাতাম, সুন্দর কাপড় পরাতাম, চুল আঁচড়ে, মুখে তাঁর পছন্দের μীম লাগিয়ে, ঠোঁটে ভ্যাসলিন মাখিয়ে দিতাম। যেদিন মা চলে গেলেন তার আগের দিন রাতেও নিজেহাতে হিমোগেøাবিন ইনজেকশন দিয়েছি। ০২ বেলা ডায়বেটিস, প্রেসার মেপে সেইমত ব্যবস্থা নিতাম। নিজেরই বিশ্বাস হতো না এই অবস্থায় মা কে হাসপাতালে নিতে পারছিনা। অথচ সামান্য সমস্যায়ও দৌড়ে হসপিটালে নিতাম! পৃথিবীর নতুন জীবনযাত্রায় বদলে গেল আমাদেরও সবকিছুৃ.. অসহায়ের মত তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই!!!???
১৩ এপ্রিল রাত বারোটার কিছু পরে , ঘরে শুধু মা ঘুমাচ্ছে আর আমি তাকিয়ে তাঁর নি:শ্বাস নেয়া দেখছিলাম একটু পরপর। সন্ধ্যার দিকে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। সেলিম নেবুলাইজ করলো আর আমি সুরা ইয়াসিন পড়ছিলাম। কি মনে হলো, রাত ১১ টার সময় মায়ের নখ কাটলাম, দাঁত পরিষ্কার করলাম। খাওয়াতে পারলাম না .. কিছু পরে নি:শ্বাস স্বাভাবিক হলো … ঘুমিয়ে গেলেন। সেই ঘুমের মধ্যেই দুটা হাত শুধু ঢলে পড়ল। আমি ভাবলাম ঘুমের মধ্যে নড়ে উঠল বোধহয়। এর কিছুপরে ভয়ে ভয়ে কাছে যেয়ে পেটে হাত দিলাম, বুকে হাত দিলাম… কি ভয়াবহ নৈশ:ব্দতা!!! শেষ হলো আমার যুদ্ধ, আমার মায়ের যুদ্ধ … অসহায়ত্ব। সবাইকে ডাকলাম। আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম আমার মা কে এবং আমাদেরকে অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্য।
মা কে নিয়ে আমরা দুজন রাত ২ টায় আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতালে গেলাম তাঁকে তৈরী করার জন্য। সব বাঁধা উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মনের জোরে বাগেরহাট চলে গেলাম। আব্বার কবরে মা কে রেখে আসলাম চিরদিনের মত। আমি সন্তান হিসাবে আমার শেষ কর্তব্য করে আসলাম। আবারো ছুটলাম ঢাকার পথে। এখন যে আমার সন্তানেরা অপেক্ষা করে আছে তাদের মায়ের জন্য, বাবার জন্য।