বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন সুসংহতকরণে অনন্য সাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শান্তিতে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ও প্রবীণ আইনবিদ নাভি পিল্লাই।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করেন। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জানান, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো বর্বরোচিত ও গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে নাভি পিল্লাই আজীবন নির্ভীক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।
দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ কর্মজীবনে তিনি অসীম সাহস ও সততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। চরম বর্ণবৈষম্যের বৈরী পরিবেশে বেড়ে উঠে তিনি আইন পেশাকে বেছে নেন বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে। কিংবদন্তি বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বহু মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার মধ্য দিয়ে তাঁর গৌরবময় কর্মজীবনের সূচনা হয়।
পরবর্তীকালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক, রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিআর) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিএইচআর) হিসেবে বৈশ্বিক মানবাধিকারের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে নিয়োজিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায়ও অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রায়োগিক প্রসার ও বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ঐতিহাসিক মামলাসমূহের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বলিষ্ঠ আইনি পদক্ষেপ যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিহত করতে পারে। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক থাকাকালে যুদ্ধকালীন ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে তাঁর আইনি রায় ছিল ঐতিহাসিক। পাশাপাশি কেবল প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করার যুগান্তকারী নজিরেও তাঁর অবদান ছিল অগ্রগণ্য।
নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে, সংঘাতের অহিংস সমাধান ও টেকসই শান্তি অর্জনের পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিচারক এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নানামুখী চাপ ও আক্রমণের মুখে রয়েছে, তখন নাভি পিল্লাই বিরল সাহস, দূরদৃষ্টি ও অবিচল দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রপ্রধান ও পরাশক্তিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সহিংসতার শিকার সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আজীবন লড়াই আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়ে অবিচল মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
সূত্র: নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি, ওসলো।