ফয়সাল চৌধুরী, কক্সবাজার প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেষে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের খালে পাকা পিলার দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করছে মিয়ানমার সরকার। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের খালে এই স্হাপনা নির্মান করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হলেও নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি বরং আরো দ্রত গতিতে শ্রমিক বাড়ীয়ে দিনরাত ব্রিজের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার।
নির্মাণাধীন ব্রিজটি মিয়ানমারের ভেতরে হলেও আগামী বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের। এমনকি ডুবে যাবে বাংলাদশের কোনারপাড়া গ্রামসহ নো-ম্যানস ল্যান্ডের রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি। সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত লোকজনের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। আতঙ্ক দেখা দিয়েছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে বসবাসকারী রোহিঙ্গা ও স্হানীয়দের মধ্যে।
স্হানীয় ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একে জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, মিয়ানামার সীমান্ত খালে ব্রিজ নির্মাণের ফলে ঘুমধুম ইউনিয়নের কোনার পাড়াসহ একটি বিশাল অংশ আগামী বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই।
এসময় তুমব্র এলাকার অন্তত ১০/১৫হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশংকা করা হচ্ছে। এছাড়াও সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্হানরত ৫ হাজার রোহিঙ্গা পাহাড়ী ঢলের পানিতে ভেসে যেতে পারে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার কৌশলী অবস্হান নিয়ে সীমান্তের রোহিঙ্গাদের তাড়াতে ব্রিজটি নির্মাণ করছে। এর আগেও মিয়ানমার সরকার তমব্র সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্হানরত রোহিঙ্গাদের সরাতে নানা চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি তাদের উপর হামলা, ভয়ভীতি, খালি মদের বোতল নিক্ষেপ, ফাঁকা গুলি বর্ষণ সহ সব ধরনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এখন নতুন করে খালে ব্রিজ তৈরির নামে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।
তুমব্রু এলাকার বাসিন্দা ও ঘুমধুম ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ছৈয়দুল বশর জানান, পুর্বের চেয়ে শ্রমিক সংখ্যা বাড়িয়ে ব্রিজের নির্মাণ কাজ দ্রত চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। তিনি বৃহষ্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমন দৃশ্য দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, এই ব্রিজটি নির্মাণ হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে তাদের বসতবাড়ী সহ ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। তাই তিনি সরকারের পক্ষ থেকে ব্রিজ নির্মাণ কাজ বন্ধে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের আহবান জানায়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত পথ রয়েছে ২৭১ কিলোমিটার। এরমধ্যে ২০৮ কিলোমিটার স্হলপথ ও ৬৩ কিলোমিটার জলসীমা রয়েছে। তেমনই এক সীমান্ত, বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের কুনারপাড়া সীমান্তের তমব্রু খালের পাশে নো-ম্যাসন ল্যান্ডে আশ্রয় নেয় প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে পালিয়ে এসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এসব রোহিঙ্গারা খালের পাড়ে গড়ে তুলেছে একটি বস্তি। এরপর থেকে মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টি এই রোহিঙ্গা বস্তির ওপর।
তমব্র সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্হানরত রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছি দেড় বছর আগে। এরপর মিয়ানমার সরকার নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে আমাদের সরানোর জন্য নানা ভয়ভীতি দেখিয়েছে। এবার নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে এ ব্রিজটি তৈরী করছে। মিয়ানমার সরকার তমব্রু খালে ব্রিজ নির্মাণের নামে বাঁধ দিচ্ছে দাবী করে সে বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে রোহিঙ্গারা এখানে মরবে।
সীমান্তে ব্রিজ নির্মাণ তোলপাড় সৃষ্টি হলে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম বায়েজিদ খান সীমান্ত পরিদর্শন করে জানান, তুমব্রু খালের ওপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার করছে। খালের ওপর আগে কাঠের খুঁটি ছিল, সেটি পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে আরসিসি পাকা পিলার দেয়া হচ্ছে। এটি কোনো সেতু বা বাঁধ নয়। তবে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে কেন তারা এটি নির্মাণ করছে তা জানতে চেয়ে সোমবার মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপিকে চিঠি দিয়েছে বিজিবি। সোমবার দুপুরের দিকে এ চিঠি দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে চিঠির জবাব আসলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হলেও এ পর্যন্ত বিজিপি’র পক্ষ থেকে চিঠির ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি বলে বিজিবি’র সুত্র জানিয়েছেন।