ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও বহুল প্রতীক্ষিত আয়োজন হিসেবে নারায়ণগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন জার্মানির বাৎসরিক পিঠা উৎসব এবছরও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। গালুস সালবাউয়ের প্রশস্ত মিলনায়তনে বিকেল থেকেই নানা বয়সী প্রবাসী বাংলাদেশিদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। ফ্রাঙ্কফুর্টসহ আশেপাশের বিভিন্ন শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আগত অতিথিরা অংশগ্রহণ করেন এই মিলনমুখর আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে।

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে যার সূচনা হয়, তেলাওয়াত করেন ইউশা ও তাশরীফ। তাঁদের সুমধুর কণ্ঠে পরিবেশিত তেলাওয়াতে সৃষ্টি হয় শান্তিময় ও পবিত্র আবহ। পরবর্তীতে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হলে উপস্থিত অতিথিদের মাঝে জাগ্রত হয় দেশপ্রেম ও শেকড়ের প্রতি আন্তরিক অনুভূতি। অনুষ্ঠানের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরউদ্দিন মিঞ্জু সোনারগাঁও উষ্ণ শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন, যেখানে তিনি প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লালনের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সবাইকে ধন্যবাদ জানান সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য।

আনুষ্ঠানিকতার পর শুরু হয় বর্ণিল সাংস্কৃতিক পর্ব। উপস্থাপনায় ছিলেন স্মিতা মোতালেব ও সোহরাব হোসাইন, যাঁদের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় পুরো সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য। সঙ্গীত পরিবেশনায় মান্নান খান, মাহবুবুল আলম, এনামুল মোহাম্মদ, রিয়েল আনোয়ার এবং খুশি তাঁদের কণ্ঠে পরিবেশিত গান দিয়ে দর্শকদের মনোমুগ্ধ করেন। আধুনিক, লোক ও স্মৃতিবিজড়িত বাংলা গান মিলিয়ে পরিবেশিত সংগীত ছিল যেন প্রবাসীদের হৃদয়ের অনুভূতির রঙিন প্রতিচ্ছবি। নৃত্য পরিবেশনায় শিশু শিল্পী ইশরা, মাইরা ও মাইশা তাঁদের নিষ্পাপ উপস্থাপনায় সবার মন জয় করে নেয়। পাশাপাশি বড়দের দলে সায়মা ইসলাম ও সামাদ্রা জামিল মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করেন, যা অনুষ্ঠানের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। কবিতা আবৃত্তি করেন হ্যাপি উদ্দিন, যার আবৃত্তির গভীরতা ও আবেগ দর্শকদের মনে সৃষ্টি করে সাহিত্যিক স্পর্শ।

সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল অতিথিদের জন্য সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। তবে দিনের সবচেয়ে আলোচিত ও আকর্ষণীয় অংশ ছিল নানান ধরণের পিঠার প্রদর্শনী। সমিতির সদস্যদের পাশাপাশি অতিথিরাও নিজের হাতে তৈরি করে নিয়ে আসেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা- যার বৈচিত্র্য ও স্বাদ যেন সবার মনে ফিরিয়ে আনে গ্রামের শীতের সকাল আর পারিবারিক উৎসবের স্মৃতি। পাটিসাপটা, ভাপা, চিতই, দুধচিতা, নারকেলি, কলাপিঠা, পুলি, তেলপিঠাসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জনপ্রিয় পিঠার সমাহার মিলনায়তনের প্রতিটি টেবিলে ছড়িয়ে দেয় নস্টালজিয়ার মধুর সুবাস। প্রতিটি পিঠা কেবল স্বাদের জন্য নয়, প্রবাসে থেকেও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রতীক হিসেবে অতিথিদের মনে বিশেষ আনন্দের সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল উচ্ছ্বাস, হাসি, গল্প আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ। পিঠা উৎসব কেবল খাবারের আয়োজন নয়; বরং প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করার, নতুনদের সঙ্গে পরিচিতির সুযোগ তৈরি করার এবং সাংস্কৃতিক শিকড়কে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। নারায়ণগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের এই বাৎসরিক আয়োজন আবারও প্রমাণ করে যে ভিনদেশে থেকেও বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসব প্রবাসীদের হৃদয়ে একই আবেগে প্রজ্বলিত থাকে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই মিলনমেলা যেন আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয়-বাংলার মাটি, মানুষ, উৎসব ও ঐতিহ্য কখনো হৃদয় থেকে মুছে যায় না।