প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, মানহানি, ভুল তথ্য প্রচার এবং ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশির ক্ষমতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের আশঙ্কা, খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত বেশ কিছু বিধান অনুসন্ধানী ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করতে পারে। বিশেষ করে অস্পষ্ট সংজ্ঞার ভিত্তিতে অপরাধ নির্ধারণ, কঠোর শাস্তির বিধান এবং কনটেন্ট অপসারণের বিস্তৃত ক্ষমতা সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খসড়ার ৮(২) ধারায় জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান সাইবার আইনেও এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নতুন খসড়ায় শুধু প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, সম্ভাব্য আশঙ্কার ভিত্তিতেও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ কিংবা ‘অবমাননাকর’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এমন তথ্যও এর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাংবাদিকদের আশঙ্কা, এ ধরনের বিস্তৃত বিধান সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
খসড়ায় আইনটি প্রয়োগের ক্ষমতা নতুন কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এর মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ আইনের আওতায় গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ ও অন্যান্য কনটেন্টের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যমান আইনের ২৫ ধারায় মূলত অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি এবং শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত উপাদানের মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ধারাটির পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে মানহানি, অপমান, হেয় প্রতিপন্ন করা, বুলিং এবং কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে—এমন বক্তব্য, প্রকাশনা ও প্রতিবেদনকেও অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের মতে, এসব বিধানের ব্যাপক প্রয়োগের সুযোগ থাকলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আপত্তি জানালেই আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি কোনো সংবাদে মানহানির অভিযোগ তুলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও দেখা দিতে পারে। খসড়ায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে কনটেন্ট ও নথিপত্র জব্দ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি জব্দ করা হলে তা শুধু নির্দিষ্ট প্রতিবেদন নয়, পুরো প্রকাশনা কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ২৫ ধারায় শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুই বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী কিংবা ১৮ বছরের কম বয়সী হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অধিক জরিমানার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিকদের আশঙ্কা, সংবাদ প্রতিবেদন-সংক্রান্ত অভিযোগেও এ ধরনের কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগের সম্ভাবনা থাকলে তা গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। এর ফলে স্পর্শকাতর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা নিজেরাই সংযত হয়ে পড়তে পারেন।
খসড়ার প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ বলতে সুনির্দিষ্টভাবে কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খসড়ায় অসমর্থিত কিংবা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবির মাধ্যমে বিভ্রান্তি, ভয় কিংবা সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে—এমন বিষয়ও গুজবের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু কোনো তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, অপরাধের নির্দিষ্ট উপাদান কিংবা সম্ভাব্য ক্ষতির সীমা স্পষ্ট না থাকলে আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২৫ ও ২৬ ধারায় ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘ভুল তথ্য’, ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ ও ‘ভুয়া খবর’-এর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকাও এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জনস্বার্থে প্রকাশিত কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা যাচাই প্রক্রিয়াধীন কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে এসব বিধানের ব্যাখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। অন্যথায় অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কায় সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে পারেন।