নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রদর্শনী ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন শ্রদ্ধেয় নাজিব তারেক। তার এই বিশ্লেষণধর্মী লেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রতিষ্ঠান কাউকে শিল্পী বানায় না। প্রতিভাকে শাণিত করে মাত্র। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর যে যাত্রা তাই প্রতিষ্ঠান। যেকোন যৌথ যাত্রায় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
এবারের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন, শায়লা আক্তার, রিফাত জাহান, রেহানা ইয়াসমিন রেবেকা সুলতানা, মনিরা সুলতানা, মুক্তি ভৌমিক, মণিদিপা, ফারজানা ইসলাম এবং ফারহানা আফরোজ।

একদল নারী চিত্রকর, যারা সহপাঠিনী, যৌথ যাত্রার চার বছর পার করছে। কিটি পার্টি’ থেকে যে যাত্রাটা কতদূর এগুলো? পাঁচটি প্রদর্শনী মাত্র কি? যদি পাঁচটি প্রদর্শনীকেও বিবেচনা করি তবে সেই প্রদর্শনীর পিছনে যে ব্যক্তি ও যৌথ শ্রম তাকে কি অস্বীকার করা যায়! যেকোনো যৌথ যাত্রায় নেতৃত্ব এক কঠিন সংগ্রাম। এখানেই ভেঙে যায় যৌথ যাত্রার পথ। চার বছর যখন পেরিয়ে গেছে তখন বলতেই হয় নেতৃত্ব ও যৌথ যথেষ্ট শক্তিশালী। সৈয়দ আজিজুল হক যথার্থই বলেছেন- ‘ক্রমেই শক্তিবৃদ্ধি হয়ে উঠছে তাদের এই যাত্রার মূলকথা’।

কিন্তু সে শক্তি কতখানি শিল্প যাত্রা। এ চার বছরেও তাদের কোন শিল্প ঘোষণাপত্র নেই। সেটা জরুরীও নয়। কিন্তু শিল্প, যা কিনা সীমানাকে অতিক্রম করতে গিয়ে সীমানাতেই বাড়িয়ে নেয়, সেখানে কি পরিস্থিতি? এখানে আমাদের ব্যক্তির শিল্প-ভাবনা ও তার প্রকাশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

মণিদিপার ছবিকে আমরা ‘আর্ট ডেকো’ চিত্র ভাষার অন্তর্গত বলতে পারি। রিফাত ও রেবেকার ছবিও তাই। মণিদিপার ছবি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সৌরভ বহন করলেও রেবেকা অনেক বেশি মধ্য-এশীয়, রিফাতা পূর্ব ইউরোপে সৌরভ ছুঁয়েছেন। এবারে প্রদর্শনীতে মণিদিপার ছবির রং বদলেছে,কালো, সবুজ ও নীল প্রাধান্য থেকে বেরিয়ে হলুদ ও লালের প্রাধান্য লক্ষণীয়। এই পরিবর্তন সাক্ষ্য দিচ্ছে কল্পনার শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে।

রিফাত এবারের ছবিতে যে নারী অবয়ব যুক্ত করেছেন, যা বেঙ্গল – স্কুলকে প্রতিনিধিত্ব করে, পাখিগুলো অনেক বেশি পশ্চিমা। তার এই মিশ্রণ দৃষ্টিনন্দন হয়েছে বলা হচ্ছে না যেমন তেমন দৃষ্টিকটূও নয়। আরো কিছু অনুশীলন ও নির্মাণের পরেই বলা যাবে এ প্রয়াস সফল না ব্যার্থ। রেবেকা দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন এ ধারায়, শিল্পের অবস্থান থেকে যা এক নিরাপদ অবস্থান বটে, কিন্তু বৈচিত্র্য পিয়াসি দর্শকের উৎসাহ হারানোর জন্য যথেষ্ট। আর অনুশীলন ও অধ্যায়নের মধ্য দিয়ে মলি এ যাত্রাকে সংহত করবেন, নাকি নিজেকে ভেঙে বেরিয়ে আসবেন -তা তার সিদ্ধান্ত।

ফারহানা গত কয়েক বছরের নকশাক্রমের বিমূর্ততা থেকে সরে এসে তার ছাত্রজীবনের অবয়বী ও চলমান বিমূর্ততার মিশ্রণে যে ছবি নির্মাণ করছেন তা প্রচলিত চিত্র চর্চার বৈশ্বিক ধারায় ভাবনাগত দিক থেকে নতুন নয় বটে, তবে দৃষ্টিগত বিচারে নতুন সম্ভাবনা,যা শিল্পীর নিজস্বতার সন্ধান প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ।শায়লা বিমূর্ততার নিবিড় সন্ধানকে গল্প দিতে চেয়েছেন কি? হয়তো! চাঁদ বিলাস সে ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ছবি শেষ পর্যন্ত রুপ সন্ধান, গল্প নয়।

গত শতাব্দীর শেষ পাঁচ দশক জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশী ভাস্কর এরা এক নিজস্ব ধারা নির্মাণ করেছেন। যা হারিয়ে যাচ্ছে বা পরিবর্তিত হয়ে নতুন ভাস্কর্য ভাষা তৈরি হচ্ছে। ফারজানা, মুক্তি, রেহানা ও মনিরা সে ধারার প্রতিনিধি। রেহানা ও মনিরা মৃৎ ভাস্কর্যে তাদের চর্চা সক্রিয় রেখেছেন।রেহানা পূর্ণ ভাস্কর্য নির্মাণে সচেষ্ট হলেও মনিরা নতোন্নত ভাস্কর্য নিয়েই আছেন।

শিলা এবার বাস্তব বিন্যাস থেকে সরে এসে ঝুঁকেছেন পরাবাস্তবের দিকে, মনিরা গাছের পাতার বিন্যাস থেকে সরে মজেছেন বিমুর্ত আকৃতির বিন্যাসে, একই সাথে মাটির রঙ থেকে সরে বিবিধ রঙ যুক্ত করেছেন।

ফারজানা ও মুক্তি ধাতু -ঢালাইয়েই সাধারণত তাদের ভাস্কর্য নির্মান করেন। মুক্তির ভাস্কর্য শৈশব স্মৃতির অলংকরণ, দেখা অথবা শিশুতোষ বইয়ের পড়া ছোট ছোট গল্পের ত্রিমাত্রিক উপস্থাপন। ফারজানা ধাতু- ঢালাই থেকে সরে মৃৎ ভাস্কর্য গড়েছেন-রুপ ভাবনায় যা দেশীয় মাটির পুতুল ও আধুনিক ভাস্কর্যের মিশ্রণ। 
‘কালারস’ এর এবারের প্রদর্শনী আগের চার প্রদর্শনীর ধারাবাহিকতা যেমন,তেমনি পরিবর্তনেরও ইঙ্গিতবহ। এটাই শক্তি।
প্রদর্শনীর সময়সূচি: প্রদর্শন প্রদর্শনীটি চলবে ৩১ আগস্ট ২০১৯ পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল তিনটা থেকে রাত নয়টা এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকাল ৫ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি খোলা থাকবে। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।