কে না জানে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন হওয়ার নানা কারণ যে আছে, এ কথা এখানে উল্লেখ না করলেও হয়। দেশের প্রতি এই উদ্বিগ্নতার অভিঘাত আমাদের শহরে এসেও লেগেছে। এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রতিটি মানুষের যেমন দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক, তেমনি এর প্রকাশও হবে ভিন্ন, এটাও স্বাভাবিক। ভিন্ন মত, ভিন্ন দল, ভিন্ন ধর্ণ, ভিন্ন ধর্ম নিয়েই তো এই পৃথিবীর মানবজাতির বসবাস। সব কিছু ভিন্ন হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সবারই একটি ঐক্য আছে।
আমরা একই সূর্যের আলোয় আলোকিত। আমাদের এই সবুজ গ্রহের একটাই উপগ্রহ চাঁদ। আমরা সারা পৃথিবীর সকলে একই স্নিগ্ধ চাঁদের জোছনা নিয়ে গান গাই – এতো বড় আকাশটাকে ভরলে জোছনায় / ও গো চাঁদ এ রাতে হায়, তোমায় ভুলা দায়….। তেমনি আমাদেরও একটি দেশ : বাংলাদেশ। আমাদের ভাষাও এক : বাংলা। আমাদের একটিই জাতীয় সংগীত : আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। বঙ্গবন্ধু আমাদের সবার। রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবার কবি। নজরুল, দ্বীজেন্দ্র লাল রায়, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, লালন আমাদের সবার৷ জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জয়নুল আবেদীন, মাযহারুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সবার। আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলীম, আব্দুল জব্বার, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনা আমাদের সবার। এই যে কিছু ধ্রুব ও স্বতসিদ্ধ বিষয়, মানবজাতির জন্য এগুলো একক ও অপরিবর্তনীয়। এবং আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, এই ভাবনাকেও জাগিয়ে দিতে হয় কোন সলতেতে আগুন দিয়ে।

ঐ যে শত শত বছর আগে আমাদের এক কবি বলেছিলেন – জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত। আমাদেরও বাংলাদেশের প্রবাসী ভাইবোনেরা কোন এক জাদুর কাঠি স্পর্শ পেয়ে মুহূর্তেই সব অভিমান, দূরত্ব, তিক্ততা ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যেতে পারি। হাতে হাত ধরে চোখের জলে ভাসতে পারি। পরস্পরের কাঁধের স্পর্শ পেয়ে সহজেই অনুভব করতে পারি, আমরা কেউই কারো কাছ থেকে দূরে নই!
দিলারা নাহার বাবুর একক আবৃত্তি সন্ধ্যা ‘শুধু কবিতার জন্য’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আবৃত্তি শিল্পী ফ্লোরা নাসরিন ইভা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাহিদ হোসেন পিয়ানো কীবোর্ড বাজিয়ে আমাদেরকে এক লহমায় দেশের প্রতি ভালোবাসার সুতো দিয়ে সবাইকে একটি মালায় গেঁথে দিলেন। ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা এবং ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা….গান দুটির যন্ত্র বাদনের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত অডিটোরিয়ামের শ্রোতারা সমবেত কণ্ঠে আকাশ বিদীর্ণ করা এক অত্যুচ্চ আবেগের স্ফুরণ ঘটিয়েছিলেন। চোখের পানি লুকোনোও যে কত কষ্ট আমি, টের পেয়েছিলাম। তখন এক অদম্য সাহসে আমার বুক ফুলে ফুলে উঠছিল এই ভেবে যে, আমাদেরকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা কোন অশুভ শক্তির কাছে হারবো না। আমরা কোনভাবেই এমন কোন শক্তির কাছে মাথা নত করবো না, যারা ধর্মের ও সংখ্যাগরিষ্ঠের অজুহাত দিয়ে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে।
আমাদের দেশের সবুজ অবারিত সবুজ প্রান্তর ও স্রোতস্বিনীর গভীর প্রবাহে এমন এক যাদুময় নির্মল সুর আছে, যা শোনামাত্র আমরা এক হয়ে যাই৷ আমাদের আর কোন বিচ্ছিন্নতাবোধ থাকে। দিলারা নাহার বাবু ও জাহিদ হোসেন ব্যক্তি মানুষও এরকমই। নির্বিবাদী, নিরহংকারী, অজাতশত্রু। শিল্পী বাবুর তো আজ সারা পৃথিবীব্যাপী ভক্ত-শ্রোতা। আমাদের কাছে বাবু এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিবারের একজন অনিবার্য মানুষ। টরন্টো শহরে কবিতা আবৃত্তিকে যে কয়েকজন খুবই জনপ্রিয় করেছেন এবং নিজেরাও অনেক অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছেন দিলারা নাহার বাবু তাদের প্রথম সারির একজন।
আকুলতা শব্দটার যে মানে, তার প্রকাশ ঘটাতে পারেন সংবেদনশীল শিল্পীরা। তাদের কণ্ঠে সেই আকুলতা ফুটে ওঠে পরিপূর্ণভাবে। বাবু যখন আবৃত্তি করেন, পাতা ঝরার মতো অনুভবের সুক্ষ্ম ধ্বনিটাও তার আকুল কণ্ঠে মূর্ত হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, কবিতায় বর্ণিত গল্পের চরিত্রটিও উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের নিপুণ ভঙ্গিটিরও তার জানা।
গত ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় ডন অফ ড্যানফোর্থ অডিটোরিয়াম ভর্তি দর্শকশ্রোতা বাবুর একক আবৃত্তি উপভোগ করেছেন। শুরুতে ফ্লোরা নাসরিন ইভা দিলারা নাহার বাবু সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছেন। পরিমিত কথার মাঝেও বাবুর প্রতি তার ও এই শহরের মানুষের ভালোবাসার পরিস্কার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন ইভা। এটাও উল্লেখ করেছেন ইভা, এই শহরের মানুষ বাবুকে ভালোবেসে ‘কবিতাকন্যা’ উপাধি দিয়েছেন। বাবুকে শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও উপস্থাপক রুমানা চৌধুরী। প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরী ও কবি ইকবাল হাসানকে বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন বাবু। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। তাঁদের কবিতা আবৃত্তি করেছেন।
মায়ের সাফল্য দেখে একমাত্র কন্যা ফাবলিহা নাওয়ার ( টুম্বুর) অসাধারণ কথা বলেছেন – মা দিলারা নাহার বাবু সম্পর্কে। বাবুর সাহস, অকপট বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, জেদ, পাগলামো, ভ্রমণ পিয়াসী মন, আবৃত্তির প্রতি একাগ্রতার কথা বলে সবার মন জয় করেছে বাবুর কন্যাও। আবৃত্তি চর্চার পাশাপাশি ব্যক্তি বাবু এক অনন্যসাধারণ মানুষ আমার কাছে। বাবুর সৌজন্যবোধ, আন্তরিকতা, মানুষের প্রতি মায়া, শ্রদ্ধাবোধ সব কিছুর সমন্বয়ে দিলারা নাহার বাবু বন্ধু মহলে সবার প্রিয়। এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিবারের বন্ধনসূত্রের বেশ কয়েকটি পিলার বা খুঁটি আছে, দিলারা নাহার বাবু তাদের অন্যতম একজন।
বাংলা কবিতার অনিবার্য কবিদের সঙ্গে এই শহরের পাঁচজন কবির কবিতা আবৃত্তি করে বাবু কবিদের সঙ্গে সম্মানের সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। এই শহরের পাঁচজন কবি যথাক্রমে : কবি কাজী হেলাল, কবি ড. বাদল ঘোষ, কবি পারভেজ চৌধুরী, কবি পারভেজ চৌধুরী ও কবি জামিল বিন খলিল। এখানে উল্লেখ্য যে বাবুর সকল পোস্টার, ব্যানার, টিকেটের ডিজাইনের গ্রাফিকস শিল্পী জামিল বিন খলিল। স্লাইড ও প্রজেকশনে ছিলেব – আরিয়ান হক। শব্দ নিয়ন্ত্রণে রিংকু। ‘বাংলা টিভি’র সাজ্জাদ আলী মিডিয়া পার্টনার হিসেবে সহযোগিতা করেছেন। আলোকচিত্র ধারণ করেছেন- বিদ্যুৎ সরকার, রাশেদ শাওন, ইত্তেজা আহমেদ টিপু, শিখা আখতারী আহমাদ প্রমুখ। আপ্যায়নের আয়োজন করেছেন হাকিম খান ও ফারাহ খান। আর অন্যস্বর ও অন্য থিয়েটারের সকল সদস্য ও বাবুর বন্ধুরা সার্বক্ষণিকভাবে মিলনায়তনের পুরো তদারকিতে তো ছিলেনই।
দিলারা নাহার বাবু ও জাহিদ হোসেন যৌথভাবে মানুষের মন জয় করেছেন বাবুর একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানে। বাবু ও জাহিদ হোসেন সেই গানের যন্ত্রবাদন দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি করেছেন, যে গান ও সুরের মাধ্যমে আমাদের দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মনপ্রাণ বিগলিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এই গান শোনামাত্র নিজেরাই হয়ে ওঠেন একেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। কেননা, চোখের জলে ভেসে জগতের সকল সম্মান ও শ্রদ্ধার অর্ঘ্য সাজিয়ে আমরা সবাই গাইতে পারি – সবকটা জানালা খুলে দাওনা ; ওরা আসবে, চুপি চুপি ; যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ ; সবকটা জানালা খুলে দাওনা……!