আরিফ ঢালী, বাগেরহাট প্রতিনিধি: সেদিন সিডরের ধ্বংসস্তুপ থেকে জেগে ওঠা উপকূ’লীয় বাগেরহাটের শরণখোলার হাজারো বিধ্বস্ত কন্ঠে একটি দাবি উচ্চারিত হয় “আমরা ত্রাণ চাইনা, একটি টেকসই বেঁড়িবাধ চাই”। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটে যাওয়া সেই সুপার সাইক্লোন সিডরের এগারো বছর পূর্তি আজ বৃহস্পতিবার। সে বছর টেকসই বেঁড়িবাধ না থাকায় প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় “সিডর” এ উপজেলার সহস্রাধিক প্রাণ কেঁড়ে নিয়েছিল। সেদিন সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল হাজার হাজার পরিবার। বিধ্বস্ত এ জনপদের মানুষ স্বজন হারানোর শোক ভুলে সে দিনের পর থেকে একটি টেকসই বাঁধের দাবিতে গড়ে তোলে আন্দোলন। সেই আন্দোলন চলতে থাকে বছরের পর বছর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে বাঁধ নির্মান কাজ শুরু হয়। কিন্তু আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে শরণখোলাবাসীকে। নামে টেকসই বেঁড়িবাধ বলা হলেও বাস্তব অবস্থাটা একেবারেই ভিন্ন। মাটির কাজ চলমান। অথচ নদী শাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। বøক ডাম্পিং করে নদী শাসন না করেই নির্মান কাজ শুরু করায় বাঁধ বার বার ধসে পড়ছে। এতে বাঁধ কতোটা টেকসই হবে- ঘুরে ফিরে সেই প্রশ্ন উঠে আসছে মানুষের মুখে। জানা গেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪’শ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ‘সিএইচডব্লিউই’ নামের চায়নার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাটি ও ব্লক বাঁধ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে শরণখোলা উপজেলার চারটি ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার একটিসহ মোট পাঁচটি ইউনিয়ন “সিইআরপি” নামে এ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় দুই বছরে বলেশ্বর ও ভোলানদী বেষ্টিত শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ ও ৩৫/৩ পোল্ডারের ৬৫ কিলোমিটার বাঁধের প্রায় ৩০ ভাগ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে- এমনটা দাবি করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বলেশ্বর নদী তীরবর্তী খোন্তাকাটা, রায়েন্দা ও সাউথখালী এলাকা সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ। উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এই তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ২০ কিলোমিটার বাঁধের মাটির কাজ শুরু হয় প্রথমে। কাজ চলমান থাকার মধ্যেই সাউথখালী ইউনিয়নের বগী কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে ও নতুন স্লুইচগেটের উত্তর পাশের দুটি পয়েন্ট, তাফালবাড়ি লঞ্চঘাট সংলগ্ন স্লুইচগেট, গাবতলা বেড়িবাঁধের দুটি পয়েন্ট, রায়েন্দা ইউনিয়নের রাজেশ্বর, লাকুড়তলা এবং খোন্তাকাটা ইউনিয়নের পূর্ব খোন্তাকাটা (কুমারখালী) এলাকাসহ প্রায় ১০টি পয়েন্ট বলেশ্বর নদের ঢেউয়ের আঘাতে একাধিকবার ধসে পড়ে। নদী শাসন না করার কারণে প্রবল ঢেউয়ে বাঁধের তলদেশ থেকে মাটি সরে গিয়ে বারবার এমন বাঁধে ধসের সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর কাঙ্খিত বাঁধ নির্মান শুরু হওয়ায় বিধ্বস্ত এই জনপদের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলো। ভেবেছিলো জলোচ্ছ্বাসে তাদের আর জানমাল কিছুই হারাতে হবেনা। কিন্তু বেঁড়িবাধের কাজের মান এমন পর্যায়ে, যা তাদেরকে এখন আরো আতঙ্কিত করে তুলেছে। সাউথখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন তাফালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ফরিদ খান মিন্টু, উত্তর সাউথখালী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম হালিম, বগী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রিয়াদুল পঞ্চায়েত, চালিতাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আ. রাজ্জাকসহ অনেকই আক্ষেপ করে বলেন, সিডরের পর সরকারের কাছে শরণখোলার মানুষের প্রাণের দাবি ছিলো একটি টেকসই বেড়িবাঁধের। দীর্ঘ বছর পর তা শুরু হলেও মানুষের মনে আশা জাগাতে পারেনি। টেকসই বাধের নামে আমাদের সাথে প্রহসন করা হয়েছে। একদিকে নদী ভাঙছে, অন্যদিকে মাটির পাহাড় গড়া হচ্ছে। নদী শাসন না করে বাধ মাটি দিয়ে যতোই উঁচু করা হোক, তা কোনো কাজে আসবেনা। শরণখোলা উপজেলা নদী শাসন বাস্তবায়ন আন্দোলন কমিটির আহবায়ক ও রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, সিডর পরবর্তী এ এলাকার মানুষের স্বপ্ন ছিলো একটি টেকসই বেঁিড়বাধের। কিন্তু বাঁধের নির্মান কাজ শুরু হলেও ভিত একেবারেই দুর্বল। নদী শাসন না করেই বাধ নির্মান করায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার বাধের বিভিন্ন পয়েন্ট ধসে পড়েছে। নদী শাসন না করে বাধ নির্মান হলে সরকারের এ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় ৪০০ কোটি টাকা জলে ভেসে যাবে। তিনি আরো বলেন, নদী শাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর একাধিক স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্পের টেন্ডার মানি দিয়েই নদী শাসনের কাজ করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। চায়নার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘সিএইচডব্লিউই’র কাজ তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েল হ্যাসকনিং গ্রুপের সুপারভেশন ইঞ্জিনিয়ার শ্যামল কুমার দত্ত বলেন, আমাদের কাজ চলমান। ২০১৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে আশা করি। এক কিলোমিটার এলাকার নদী শাসনের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।