কানন বালা দেবীর কথা কি মনে আছে? হয়তো অনেকের আছে, অনেকের নেই। আর এটাই তো স্বাভাবিক! তিনি হলেন কঠোর জীবন সংগ্রামে জয়ী বিনোদন ও সাংস্কৃতিক ভূবনের এক কিংবদন্তির তারকা।
এবার সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক কানন বালার সেই কঠোর জীবন সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে বীরোচিত জয়ের কাহিনী।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি বনফুল গো, ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে…. ’ গানটি মনে হলেই প্রথম যে কন্ঠটি কানে ভেসে ওঠে, এইচএমভি রেকর্ডের সেই কন্ঠটি কানন বালা দেবীর। সমাজের নিচুতলা থেকে উঠে আসা অবিভক্ত বাংলার এক মহাতারকা। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম ‘হার্টথ্রব’ নায়িকা-গায়িকা; বাংলার প্রথম লাক্স তারকা।
কানন বালার জন্ম ১৯১৬ সালের ২২ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম বাংলার হাওড়ায়। যদিও তাঁর জন্ম অর্থাৎ মা-বাবার সম্পর্কের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক ছিল। তবুও এটা সত্য যে, মা-বাবার সম্পর্ক যাই থাকুক না কেনো, তিনি তো ছিলেন নিষ্পাপ। ভিক্টোরীয় শুচিতার প্রতীক হেরম্ব মৈত্রের পুত্র ছিলেন কানন বালার স্বামী।
কাননের বয়স যখন ৯ বছর, তখন তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। তখন দুই মেয়েকে (কানন বালা ও তাঁর বোন) নিয়ে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় ঝিয়ের কাজ শুরু করেন তাঁর মা। সেখানকার বৈরী পরিবেশ ও নিপীড়নের তিক্ত অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে কানন বাধ্য হয়ে মাত্র ১২ বছর বয়সে ম্যাডানের স্টুডিওতে যান কর্মের খোঁজে; সোজাসাপ্টা ভাষায় রোজগারের উদ্দেশে।
কানন বালার রূপ-সৌন্দর্য ও গুণাবলী দেখে প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা তাঁকে ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দেন। ১৯২৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জয়দেব’ নামের নির্বাক ছবিতে অভিনয় করেন কানন। ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জোর বরাত’ নামের বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক ছবিরও নায়িকা ছিলেন তিনি।
কানন বালা প্রচণ্ড দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও গান শিখেছিলেন। তাঁর কন্ঠে ছিল সুমধুর সুর। কাজী নজরুল ইসলাম নিজে তাঁকে গান শিখিয়েছেন, সুর তুলে দিয়েছেন।
কানন বালা ১৯৩৫ সালে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’-এ নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। এ সময়ে তিনি কানন বালা থেকে কানন দেবীতে পরিণত হন। অপরূপা কানন এতোই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে, তাঁর আলোকচিত্র রাস্তার ধারে বিক্রি হতে শুরু করে এবং তাঁর পোশাক, অলঙ্কার, চলাফেরা ইত্যাদি নারীদের জন্যে ফ্যাশনে পরিণত হয়।
কানন বালা ১৯৩৭ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের তৎকালীন প্রখ্যাত নায়ক প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে ‘মুক্তি’ ছবি ছাড়াও আরো কয়েকটি ছবিতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন।
তাঁর জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যাপতি, সাথী, পরিচয়, শেষ উত্তর এবং মেজদিদি। ১৯৪৮ সালে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা শুরু করেন এবং ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বিশেষত মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
তিনি অভিনয় ছাড়া তিন দশকজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলা সঙ্গীতজগতে অসাধারণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত এবং আধুনিক বাংলা গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় এবং নজরুল ইসলামের কাছে গান শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া সেকালের বিখ্যাত গায়ক ও সুরকার রাইচাঁদ বড়াল, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ আল্লারাখা, পঙ্কজ মল্লিক, অনাদিকুমার দস্তিদার, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র প্রমুখের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গান শিখেছিলেন।
অভিনয়জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি সমাজ কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কানন বালার গান শুনে মুগ্ধ হতেন। অভিনয়, গান এবং নৃত্যে পারদর্শী কানন বালা দেবীর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। এই গ্রন্থে তাঁর বড় হয়ে ওঠার এসব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। গ্রন্থটি সব মহলে খুব প্রশংসিত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, অভিনয়শিল্পীদের জন্যই শুধু নয়, নিত্য যারা জীবন সংগ্রাম করে চলেছেন, তাঁদের জন্যও এই আত্মজীবনী শিক্ষনীয়।
কানন বালা দেবী তাঁর কর্মের জন্য ‘দাদা সাহেব ফালকে’ এবং ‘পদ্মশ্রী’সহ ভারত সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়া অনেক পদক, পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
কানন বালা দেবী শেষজীবনে সেবামূলক কাজে এগিয়ে আসেন। তবে, দুস্থ ও বয়স্ক শিল্পীদের সাহায্যের জন্য সবসময়ই সক্রিয় ছিলেন। নিরবেই সেসব কাজ করতেন তিনি।
এরপর ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ নাসিং হোমের এক নির্জন কেবিন থেকে প্রায় চুপি চুপি পাড়ি দেন অনন্তের পথে। সেই হাসপাতালেই দুই দশক পর সেই পথের যাত্রী হয়েছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেনও।
কানন বালা দেবীর কর্মবহুল অমর স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।