দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, বিনিয়োগ স্থবির, আর্থিক খাতে কাঠামোগত চাপ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে—ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘নতুন বাংলাদেশ: কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছরের ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।
টিআইবি জানায়, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের ক্ষেত্রে তা প্রতিফলিত হয়নি। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, কর্মসংস্থান তেমন বাড়েনি, বিনিয়োগ খাতে চলছে স্থবিরতা। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, তবে কাঠামোগত চাপে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ এখনও সীমিত।
ব্যাংক খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে দাবি থাকলেও বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কোনো মাসেই পূরণ হয়নি। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর এবং আমদানি শুল্কের তিন ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
মানবাধিকার ও আইনের শাসনের অবনতি
টিআইবির প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও চিত্র তুলে ধরা হয়। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ঢালাওভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের, গণগ্রেপ্তার, থানায় হামলা, প্রতিশোধমূলক আটক ও জামিন না মঞ্জুরের ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়।
ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, হামলা ও হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও বিচার প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত ধীর বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়। গুম-সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলেও তদন্তে অনিয়ম ও আলামত নষ্টের অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা
গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪৭১টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে বলে জানায় টিআইবি। এসব ঘটনার মধ্যে ৯২ শতাংশের সঙ্গে বিএনপি, ২২ শতাংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ৫ শতাংশের সঙ্গে জামায়াত এবং ১ শতাংশের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।” তিনি বলেন, গণ অভ্যুত্থানের পর গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’কে অনেকে ‘কিংস পার্টি’ বলছে, কারণ সরকার-সমর্থিত ব্যক্তিরা এ দলে যুক্ত রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাংশ চাঁদাবাজি, দলবাজি ও মামলাবাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একই আচরণ দেখা যাচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বিপন্ন করছে।”
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গণপিটুনিতে মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ‘মব জাস্টিস’-এর মতো প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাকেই ইঙ্গিত করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের ‘ক্ষুব্ধ মানুষের চাপ’ বলেও যেভাবে এ ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা বলেও মন্তব্য করে টিআইবি।