সম্পাদকীয় : সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে পরে উত্তরার পশ্চিম থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা নয়; বরং দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীন কণ্ঠস্বরের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের এমনভাবে আটক ও গ্রেপ্তার দেখানো কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ভয়ংকর বার্তা বহন করে।
আনিস আলমগীর একজন পরিচিত সাংবাদিক। তার পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন আচরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—এই গ্রেপ্তারের পেছনে কি কেবল আইনি কারণই কাজ করছে, নাকি সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে দমন করার প্রবণতা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানী বা সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের পরপরই ঘটে, যা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এখন প্রায় নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের অপপ্রয়োগ সাংবাদিকতার স্বাধীন পরিসরকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তার সেই ধারাবাহিকতারই অংশ কি না—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি থানার মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখানো’র প্রক্রিয়াও স্বচ্ছতার বদলে আরও ধোঁয়াশা তৈরি করছে।
গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়; বরং এটি গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সাংবাদিকরা যখন ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রশ্ন তোলেন, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয় সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়া—প্রশ্নকারীকেই শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে, আটক করে বা মামলায় জড়িয়ে রাষ্ট্র যদি নীরবতা চাপিয়ে দিতে চায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের জানার অধিকারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সরকার বারবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। আনিস আলমগীরের মতো সাংবাদিকের গ্রেপ্তার দেশি-বিদেশি মহলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলবে—এটাই স্বাভাবিক। সরকারের উচিত এসব প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়ার পূর্ণ সম্মান এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভিন্নমত দমন করে নয়, বরং সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তার যদি অবিলম্বে ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা না করা হয়, তবে তা কেবল একজন সাংবাদিকের স্বাধীনতাই নয়—পুরো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের প্রতীক হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এই প্রবণতা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। এখনই সময়, শক্তি নয় বিবেকের পথে হাঁটার।