’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষায় গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ এর উদ্যোগে আজ ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টায় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে দিনব্যাপী কনভেনশনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। কনভেনশনে দেশের বাম, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক-নারী, ডাক্তার, আইনজীবী, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, দলিত, হরিজন, সুফি, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ দেড় হাজার নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন।
প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। কনভেনশনে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। কনভেনশনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, এ্যামেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শরীফ নূরুল আম্বিয়া, সিপিবি’র সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাংবাদিক সোহরাব হোসেন, প্রকৌশলী মনির উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ, ইউপিডিএফ নেতা অংকন চাকমা, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি এস এ সবুর, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ভ‚ইয়া, স্কপ নেতা আব্দুল কাদের হাওলাদার, জাতীয় গণফ্রন্ট নেতা আমিরুল নুজহাত মনীষা, কৃষকনেতা আব্দুস সাত্তার প্রমুখ। পরিচালনা করেন বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা ডা. কমরেড জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য্য।
সভায় বক্তাগণ বলেন, অজেয় গণশক্তি ও গণসংগ্রামের মধ্যদিয়ে ’৫২, ’৬৯, ’৭১, ’৯০-এর ঐতিহাসিক বিজয় সম্ভব হলেও প্রতিবার সে বিজয় জনগণের হাতছাড়া হয়েছে। এবারও তেমনটাই ঘটছে। ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের ১৫ মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে যে, এবারের বিজয়ও বহুলাংশে হাতছাড়া হতে চলেছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার সংবিধান বহির্ভূতভাবে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে সকল দলের সর্বসম্মত সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি না করে নিজেদের মত চাপিয়ে দিয়ে জুলাই সনদের নামে মুক্তিযুদ্দের চেতনা ও ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের বিরোধী অবস্থান নিয়ে চলছে। জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে লাভজনক বন্দরসমূহ জনগণকে না জানিয়ে সা¤্রাজ্যবাদী বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। দেশব্যাপী মব সন্ত্রাস চলছে। মাজার ভাঙা, বাউল শিল্পীদের উপর আক্রমণ, শারীরিক অপদস্ত করা, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের ঐতিহ্যকে ধ্বংসের চেষ্টা হচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, মানুষ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। যেকারণে আমরা কোন চিহ্নিত স্বৈরাচারী কতৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি অথবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী গণধিকৃত উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বাইরে সকল অংশের দেশবাসীর অর্থাৎ শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের সপক্ষের শক্তিসমূহের একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম গড়ে তোলা জরুরি। সেই বিবেচনায় দেশের সকল দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী তথা বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী সংগঠনসমূহ, শ্রম, কর্ম, পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, অধিকার আন্দোলনের কর্মীবৃন্দসহ অনুরূপ অপরাপর সকল শক্তির সম্মিলনে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। যে রাজনৈতিক শক্তি ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেওয়া ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধাননে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতিতে প্রতিশ্রæত জন প্রত্যাশা, জন আকাক্সক্ষা, ঐতিহাসিক অর্জন, ’৯০-এর এবং সম্প্রতি ’২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা, স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে।
নেতৃবৃন্দ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আজকের এই কনভেনশন থেকে সকলের অংশগ্রহণে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট’ গঠন এর ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করছি। গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট তার খসড়া ঘোষণা ও কর্মসূচি সারা দেশের ব্যাপক জনগণের মতামত পরামর্শের ভিত্তিতে চ‚ড়ান্ত হবে। একই সাথে জেলায় জেলায় কনভেনশন/ মতবিনিময় সভার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দল, বিশিষ্ট প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ, শ্রেণি পেশার মানুষের সমন্বয়ে যৌথ নেতৃত্বের ধারায় পরিচালনা কমিটি তার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
নেতৃবৃন্দ গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট এর ভবিষ্যত কর্মকাÐে শামিল হওয়ার জন্য দেশের অপরাপর সব গণতন্ত্রমনা, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সমিতি ও ব্যক্তির প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।
কনভেনশনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাসদ-এর স্থায়ী কমিটির সদস্য, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মুশতাক হোসনে। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উপদেষ্টা, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড খালেকুজ্জামান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদ এর সহকারী সাধারণ সম্পদাক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, সোনার বাংলা পার্টির আহŸায়ক সৈয়দ হারুন, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক কমরেড মাসদু রানা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, গণতান্ত্রিক ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. হারুন অর রশীদ, নারী নেত্রী সীমা দত্ত, জলি তালুকদার, রুখশানা আফরোজ আশা, সাংস্কৃতিক ঐক্যের সমন্বয়ক মফিজুর রহমান লাল্টু, শ্রমিক নেতা শামীম ইমাম, জা. বি. প্রো ভিসি সোহেল আহমেদ, সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ রায়হান শাহ, শিপন রবিদাস প্রমুখ।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যুক্তফ্রন্ট গঠন আজ খুবই জরুরি। তবে এই যুক্তফ্রন্ট শুধু নির্বাচনের জন্য নয়, সমাজ বিপ্লবীদের যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে। জাতীয়তাবাদীরা ৫৪ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে তারা জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বাম-প্রগতিশীলদেরকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে। বারে বারে মানুষ জীবন দেয় নির্যাতন ভোগ করে কিন্তু ক্ষমতায় যায় বুর্জোয়ারা। ফলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে গণ অভ্যুত্থান করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে। তিনি বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, আশা করি ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ জনআকাক্সক্ষা পূরণ করবে। কারণ জনগণ চায় পরিবর্তন এটা করতে পারবে বাস্তবে বামপন্থীরা। আমি বলি বামপন্থীরাই জনআকাক্সক্ষাকে ধারণ করে ফলে তারা জনগণপন্থী। আর এ কারণেই বামপন্থীদের ওপর শাসকদের এত রাগ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা এবং কর্পোরেট ফ্যাসিবাদীরা উভয়েই বামপন্থীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও বিশোদগার করে। কারণ তারা শ্রমিক ও নারীসহ নিপীড়িত জনগণের পক্ষে কথা বলে। তিনি যুক্তফ্রন্টের ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন এই যুক্তফ্রন্টে সবাইকে যুক্ত করতে হবে কেউ যেন বাদ না পড়ে। কারণ সারা দেশে দলীয় রাজনীতি করে না কিন্তু সমাজের নানা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা থাকে। তাদেরকে এই সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে।