ভুয়া স্বাক্ষর ও জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আত্মসমর্পণের পর জামিন পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান ও তার মা মিসেস শাহনাজ রহমান। বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তারা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে এদিন মামলার চার্জশিট গ্রহণ করে আদালতে উপস্থিত না থাকায় সিমিন রহমান, তার মা শাহনাজ রহমান ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ। পরে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জামিন পান সিমিন রহমান ও শাহনাজ রহমান।
আদালত সূত্র জানায়, বুধবার মামলার অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক ও আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক আদালতে হাজির হন। তাদের পক্ষে স্থায়ী জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, আদালতে আত্মসমর্পণের সময় সিমিন রহমান ও তার মা কালো বোরকা পরিহিত অবস্থায় মুখ ঢেকে আদালতে উপস্থিত হন। শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন এবং এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন।
কী অভিযোগ মামলায়
মামলার অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় ট্রান্সকম লিমিটেডের একটি বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়। ওই সভার এজেন্ডায় ছিল পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের অনুমোদন এবং লতিফুর রহমানের শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ওই বোর্ড মিটিংয়ে হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হলেও আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর যুক্ত করা হয়, যদিও সভার সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। ওই সভার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের মালিকানাধীন ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে ৪ হাজার ৭২০টি করে শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেখানো হয়।
তবে বাদী শাযরেহ হক দাবি করেন, ২০২০ সালের ১৩ জুন এ ধরনের কোনো বোর্ড মিটিং আদৌ অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে ওই সভার নোটিশ, ই-মেইল বা ডাকযোগে পাঠানো কোনো কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নথি চাওয়া হলেও আসামিপক্ষ কোনো কাগজ উপস্থাপন করেনি।
আরজেএসসিতে অনিয়মের অভিযোগ
চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়, শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়ার সময় গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা—কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। নিয়ম অনুযায়ী উভয় পক্ষের সশরীরে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ ছাড়া শেয়ার হস্তান্তরের ফি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করে বিলম্বে পরিশোধ করা হয় বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
ভুয়া স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষরের প্রমাণ
তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২০ সালে ভাই–বোনদের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে সিমিন রহমান পারিবারিক ডিড অব সেটলমেন্ট ও কোম্পানির নথিপত্র তৈরি করেন। এতে দুটি ভুয়া নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও ডাক বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই স্ট্যাম্প দুটি ২০২৩ সালে সৃজনকৃত হলেও সেগুলো ২০২০ সালের তারিখে ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যে স্ট্যাম্প ভেন্ডরের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তার লাইসেন্স ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই বাতিল হয়েছিল। অর্থাৎ স্ট্যাম্পগুলো অসদুপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছে।
মামলার পটভূমি:২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলাটি ঘিরে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যবসায়ী পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শেয়ার হস্তান্তরের অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।