এটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তোলা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছবি। একটির পর একটি কবর; ছোট ছোট, অগভীর। যেন এই ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্ব অবশেষে তাদের জন্য একবার নুয়ে পড়তে রাজি হয়েছে; দেখলে মন ভেঙে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন: “এই কবরগুলি খনন করা হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬০ জনেরও বেশি নির্দোষ মেয়ে শিক্ষার্থীর জন্য, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন…তাদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত ‘উদ্ধার’-এর আসল চেহারা এটি। গাজা থেকে মিনাব পর্যন্ত (যেখানে ছোট মেয়েদের হত্যা করা হয়েছে), নির্দোষ মানুষ নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে।”
আমি দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত একটি ভিডিওতে, একটি করে ছোট ছোট মোড়ানো শিশু, ছোট ছোট বাক্সে রাখা, চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার অপেক্ষায়। তাঁরা এতো ছোট, একটি বাক্সেই তাদের পুরো জীবন ধরে যায়। তাঁরা সবাই মাত্র ১০ বছরের কাছাকাছি বয়সী মেয়ে, তাদের স্কুলব্যাগে সম্ভবত অসমাপ্ত পাঠ রয়েছে, তাদের জীবন পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই হঠাত করে থেমে গেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাপার মৃত্যু নয়, বরং যেগুলোর ফুল ফোটার কথা ছিল, সেগুলো ফোটার আগেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
এটা না ভেবে পারা যায় না, সেই ছোট ছোট কবরগুলিতে শুধু কিছু শিশু সমাহিত হচ্ছে না, বরং আরও কতো পরিবারের ভবিষ্যত চিরতরে অসম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ইরানিদের এখনকার ক্রোধও বোঝা যায়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন: হাসপাতালে হামলা জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলে, স্কুলে হামলা একটি দেশের ভবিষ্যতকে লক্ষ্য করে, রোগী ও শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো স্পষ্টতই মানবিক নীতির লঙ্ঘন, বিশ্বকে এর নিন্দা জানাতে হবে, আমি শোকাহত দেশের পাশে আছি, ইরান নীরব থাকবে না বা এই অপরাধের কাছে মাথা নত করবে না।
বিশ্বের এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া কী?
আমি দেখেছি, ইউনেস্কো শোক প্রকাশ করেছে: “শেখার জন্য নির্ধারিত স্থানে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন দ্বারা স্কুলকে প্রদত্ত সুরক্ষার অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।” আরও অনেক পশ্চিমা দেশ নীরবতা বেছে নিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুধু ক্ষীণভাবে বলেছেন, স্কুলে হামলা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হয়েছে কি না তা তদন্ত করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, এই বিষয়টি তাদের কোনো বক্তব্যে উল্লেখই করেননি। যদি এটি পশ্চিমা দেশে ঘটত, তাহলে কতো বড় মানবীয় ট্র্যাজেডি হতো! কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এটি ঘটেছে ইরানে, ইরানের একটি স্কুলে।
এসব ছোট মেয়েরা, দুর্ভাগ্যবশত এই অশান্ত বিশ্বে জন্ম নিয়েছিল। তাদের একমাত্র অপরাধ হল, সেদিন তারা সেই স্কুলে উপস্থিত ছিল, যেখানে বোমা পড়েছে। তারপর, তাদের এই ছোট ছোট কবরে সমাহিত করা হবে, মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে, নীরব বেদনার সঙ্গে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত, এই বিশ্ব সম্পূর্ণরূপে ভুলে যাবে তাদের।
যদিও এটি যথেষ্ট মর্মান্তিক, কিন্তু মৃত্যু থামবে না। যুদ্ধ চলছেই। ইসরায়েলের ভাষ্য অনুসারে, ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে, ইরানের ১৫০০-এরও বেশি রেভলিউশনারি গার্ড সদস্য নিহত হয়েছেন। বেসামরিক নাগরিকদের সম্পর্কে ইসরায়েল কিছু বলেনি। এই যুদ্ধবিদ্ধস্ত অঞ্চলে, বেসামরিক নাগরিকরা শুধু সংখ্যা, শুধু সমাধিফলকের নামগুলোই জানে, এটি কার বাবা, কার মেয়ে, কার পুরো পৃথিবী ছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনও একের পর এক ইসরায়েল ও পার্শ্ববর্তী সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ইত্যাদি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাসে বর্ষিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারেনি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইতিমধ্যে কমপক্ষে ৬ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এ ছাড়াও, কুয়েত ২রা মার্চ ভুল করে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
কেন ইরানে আক্রমণ?
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য পরিবর্তিত হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, বিরোধীদের দমনে ইরানি সরকারের ভূমিকার শাস্তি দিতে হবে; পরে তিনি দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে হবে; যুদ্ধ শুরুর পর তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের শাসকদের সম্পূর্ণ উৎখাত করা হবে। এখন, আবার অবস্থান বদলেছে। ট্রাম্প ২রা মার্চ বলেছেন: “আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট… প্রথমত, আমরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করছি – আপনি প্রতি ঘণ্টায় দেখতে পাচ্ছেন – এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির তাদের সক্ষমতা, যা বেশ ভালো; দ্বিতীয়ত, আমরা তাদের নৌবাহিনী নির্মূল করতে চাই। আমরা ইতিমধ্যে ১০টি জাহাজ ধ্বংস করেছি। তারা সমুদ্রতলে আছে।” আরও, ইরান “কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে” তা নিশ্চিত করা এবং ইরানকে অন্যান্য মার্কিন-বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করতে না দেওয়া। যুদ্ধ অনেক আগেই শুরু হয়েছে, হত্যাযজ্ঞ চলছেই, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কারণ বদলাচ্ছে। গোলাগুলির শব্দে আসল উদ্দেশ্য ঢাকা পড়ে গেছে, অবশিষ্ট আছে শুধু অভ্যাসগত ধ্বংসযজ্ঞ।
যুদ্ধের অগ্নিশিখা ছড়াতে শুরু করেছে।
আমি দেখেছি, হিজবুল্লাহও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে, ইসরায়েলের উত্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে; ইসরায়েল সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থা এখন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এই ভূখণ্ডে কখনও বন্দুকের গন্ধের অভাব ছিল না, অভাব ছিল শান্তির। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেছেন: আমরা বারবার এই অঞ্চলের দেশগুলোকে সতর্ক করেছি, যদি যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তা কেবল আমাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি সমগ্র অঞ্চলকে জড়িয়ে ফেলবে। “এ কারণে নয় যে আমরা এটিকে পুরো অঞ্চলজুড়ে করতে চাই, বরং কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং স্থাপনা আমাদের অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে।” তিনি বলেন, “আমাদের দৃষ্টিতে, এই ঘাঁটিগুলি বৈধ লক্ষ্য – কারণ এগুলি আমাদের আক্রমণকারী দেশগুলির অন্তর্গত, এমনকি যদি তারা দাবি করে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে না।” তিনি প্রশ্ন তোলেন: আমাদের বলা হয়, আমাদের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলা করা উচিত নয়, কারণ এই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিটি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়নি। এ কী ধরনের যুক্তি? এই বিশ্বে, আসলে কোনো যুক্তি নেই। শক্তিশালীদের হাতে থাকা যুক্তি, প্রায়শই দুর্বলদের কবরের মাটি হয়ে ওঠে। যে দেশগুলো যুক্তি দিত, তারা অনেক আগেই যুক্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে; যে দেশগুলো যুক্তি দেয় না, তারা এখন গোলা দিয়ে যুক্তি দিচ্ছে। আমি দেখেছি, ইরানের সর্বশেষ হুমকি: শত্রুরা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, এমনকি নিজের বাড়িতেও, তারা নিরাপদ থাকবে না!
ইরান যদি নতি স্বীকার না করে, তাহলে এরপর নিশ্চিতভাবেই আরও বড় বোমাবর্ষণ হবে, আরও নির্দোষ প্রাণের মৃত্যু হবে, আরও ছোট ছোট কবর খনন করা হবে।
বিভিন্ন দেশের অবস্থান ভিন্ন, অবস্থান সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই আমরা দেখছি, যে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি এতোদিন মার্কিন ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল, তারাও আবার উদ্যোগী হয়ে উঠছে। তিন দেশের নেতারা একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য তারা “প্রয়োজনীয় ও সঙ্গতিপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ” নিতে পারে। এ ছাড়াও, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেছেন, ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, যা “নির্দিষ্ট ও সীমিত” প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। আগে নানা অজুহাতে অস্বীকার করলেও, এখন পুরোপুরি মার্কিন সেনাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তথাকথিত নীতি, স্বার্থের জন্য তৈরি আচ্ছাদন মাত্র; প্রয়োজন হলে বের করা হয়, প্রয়োজন না হলে গুটিয়ে রাখা হয়।
পশ্চিমা দেশের মধ্যে ব্যতিক্রম হলো স্পেন। স্পেন ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সর্বশেষ ফ্লাইট তথ্য দেখায়, স্পেনে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত ১৫টি মার্কিন জ্বালানি বিমান স্পেন ত্যাগ করে জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি মার্কিন ঘাঁটিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। কেন? কথিত আছে, স্পেন রাজি হয়নি যে, যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের ভূখণ্ড থেকে ইরানে আক্রমণ চালাবে। এমনকি, ইংল্যান্ড অবস্থান পরিবর্তন করলেও, স্পেন দৃঢ়ভাবে রাজি হয়নি, ফলে মার্কিন বাহিনী অন্য জায়গা খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, স্পেন খুব ভালো করেই জানে, এটি আবারও একটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক যুদ্ধ, নগ্ন হত্যাযজ্ঞ। এটি আরও প্রচণ্ড ক্রোধের জন্ম দেয়। এই ক্রোধ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করবে।
অনেক পশ্চিমাদের হাসি পায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৬০ জন ছোট মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়ে নীরব, অন্যদিকে মার্কিন ফার্স্ট লেডি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন, “শিক্ষার মাধ্যমে শান্তি অর্জন” এর পক্ষে ওকালতি করছেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন ফার্স্ট লেডি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করলেন। জাতিসংঘের উপমহাসচিব রোজমেরি ডিকার্লো সুযোগটি হাত ছাড়া করতে চাননি, সোচ্চার হয়ে বলেছেন: আমরা ইরানের স্কুলের ট্র্যাজেডির প্রতিবেদন দেখেছি, “ম্যাডাম ফার্স্ট লেডি, সংঘাত থেকে শিশুদের রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল যুদ্ধ প্রতিরোধ ও শেষ করা!” কিন্তু এটা কি সম্ভব? আমার মনে হয়, ডিকার্লোর উচিত ছিল তাকে সেই বেদনাদায়ক ছবিটি দেখানো। সবাই বাবা-মা, বেশি কিছু বলার দরকার নেই, এই ধরনের ছবি দেখলে, আপনার হৃদয়ে কি রক্তক্ষরণ হবে না! সেই ছোট ছোট কবরগুলি, এখনও তাদের মালিকের অপেক্ষায়; সেই ছোট ছোট আত্মাগুলি, এখনও বিদায় জানাতে শেখেনি।
নিবন্ধটি : উইচ্যাট পাবলিক অ্যাকাউন্ট “নিউ থানছিন” থেকে সংগৃহীত।
সূত্র: স্বর্ণা-আলিম-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।