শিরোনাম :
আদিবাসী তরুণদের গবেষণায় উঠে এলো পানি সংকট ও প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসের চিত্র নজরুলকে স্মরণে ছায়ানটে সাংস্কৃতিক আয়োজন পর্যটক টানতে ৪০ দেশের জন্য ভিসা ফ্রি করল শ্রীলঙ্কা সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের বৈঠক চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাক্ষাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নৈতিকতা ও অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিল ইউনেস্কো নেতানিয়াহুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বিশ্বকাপে মেক্সিকোতেই থাকবে ইরান দল ঈদের সার্বিক নিরাপত্তা ও মহাসড়ক তদারকিতে কঠোর অবস্থানে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হজের প্রথমদিন, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত মিনার প্রান্তর

আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তে রাষ্ট্রহীনতার ফাঁদে তাহের আলী

জার্মান-বাংলা ডেস্ক, ঢাকা অফিস:
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬

ভারতের আসামের নগাঁও জেলার বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সি হাসান আলীর দিন কাটছে গভীর উৎকণ্ঠায়। উদ্বেগের কেন্দ্রে তার ৫৮ বছর বয়সি বাবা তাহের আলী। জানুয়ারির কনকনে শীতে বৃদ্ধ বাবা কীভাবে একা দিন কাটাচ্ছেন, আদৌ নিরাপদ আছেন কি না—এই প্রশ্নই প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে হাসানকে।

সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসান আলী জানিয়েছেন, গত আট মাসে তার কৃষক বাবা তাহের আলীকে অন্তত তিনবার ভারত থেকে জোর করে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন নোম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পেশায় সবজি বিক্রেতা হাসান নিজেও দুবার বাবাকে ফেরাতে গিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাকে ফেরত পাঠিয়েছে।

তাহের আলী আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত একজন ‘বিদেশি’। এই আধা-বিচারিক ট্রাইব্যুনালে তিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। যদিও তার পুরো জীবন কেটেছে আসামেই। মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীদের অভিযোগ, আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল বহু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বক্তব্য না শুনেই একতরফা আদেশের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। তাহের আলীর মতো অসংখ্য মানুষ এভাবে নাগরিকত্ব হারিয়েছেন।

আইন অনুযায়ী, বিদেশি ট্রাইব্যুনালে মামলায় হেরে গেলে উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। অনেককে রাজ্যের ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানোও হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কারণ, ট্রাইব্যুনালের রায়ে কোথাও প্রমাণ হয়নি যে, এসব মানুষ আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক।

পরিস্থিতির মোড় ঘোরে গত বছরের মে মাসের পর। অভিযোগ উঠেছে, আসামের বিজেপি সরকার নির্বাসনের আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে গিয়ে ‘ঘোষিত বিদেশি’দের রাতের অন্ধকারে বন্দুকের নলের মুখে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এ ধরনের জোরপূর্বক বহিষ্কারের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের একটি আইন প্রয়োগ করছেন।

নভেম্বর থেকে রাজ্য সরকার আরও কঠোর হয়ে ২২ জন ঘোষিত বিদেশিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এতে করে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশ এসব মানুষকে গ্রহণ করছে না। ফলে তাহের আলীর মতো বহু মানুষ ভারত থেকে ‘পুশ ইন’, আবার বাংলাদেশ থেকে ‘পুশ ব্যাক’—এই দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছেন।

তাহের আলী একা নন। স্ক্রল–এর অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর থেকে আসামের অন্তত সাত বাসিন্দাকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিজিবি তাদের ঢুকতে না দেওয়ায় পাঁচ দিন পর তারা ভারতে ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসেই আবারও জোরপূর্বক সীমান্তে পাঠানো হয় তাদের। এর মধ্যে কয়েকজনকে সর্বশেষ ২৮ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম জেলা থেকে ধারণ করা একটি ফেসবুক ভিডিওতে দেখা গেছে। প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তাদের মধ্যে চারজন বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তাহের আলীর মতো অন্তত আরও একজনকে তিনবার বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি—১৯৫০ সালের আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না কিংবা বহিষ্কারের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাই করা হয়েছিল কি না।

তবে আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, আসাম সরকারের এই নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল গবেষক অভিষেক সাহা বলেন, “ভারতের এই আচরণ কার্যত রাষ্ট্রহীনতার জন্ম দিচ্ছে। ভারত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করছে। মানুষগুলোকে দুই দেশের মধ্যে টেনিস বলের মতো ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।”

বেদনার সুরে হাসান আলী প্রশ্ন তোলেন, “ভারত বলছে আমার বাবা বাংলাদেশি, বাংলাদেশ বলছে তিনি তাদের নাগরিক নন। তাহলে তার দেশ কোনটি? আমাদের কি আদৌ কোনো দেশ আছে?”

দিল্লির আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, ১৯৫০ সালের আইন কেবল তখনই দ্রুত বহিষ্কারের সুযোগ দেয়, যখন কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা বা জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। কিন্তু যাদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, তারা ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর—এমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি।

আসাম–বাংলাদেশ সীমান্তে আটকে পড়া তাহের আলী ও তার মতো মানুষের গল্প তাই শুধু নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়—এটি মানবিক বিপর্যয় ও রাষ্ট্রহীনতার এক নির্মম দলিল।

সূত্র: আমার দেশ।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

©germanbanglanews24
Developer Design Host BD