রোববার (২২ জুন) বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহ উদ্দিন খান দশম থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করা তিন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, নুরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেন
পরে সন্ধ্যায় উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরে নুরুল হুদার বাসায় ফরিদের নেতৃত্বে হানা দেয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। তারা সাবেক সিইসিকে বাসা থেকে বের করে এনে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়। জুতা দিয়ে পেটানো হয়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের উপস্থিতিতেই নুরুল হুদাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা স্তা করা হয়। পরে রাতে নুরুল হুদাকে নেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে। সেখান থেকে তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এরপর সোমবার (২৩ জুন) বিকালে তাকে আদালতে তোলা হয়। আদালত নুরুল হুদাকে চার দিন রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
নুরুল হুদাকেকে গ্রেপ্তারের পর রাতেই বিবৃতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিবৃতিতে জনতার হাতে হেনস্থার ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই বিবৃতিতে সরকার বলেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর আক্রমণ ও তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা বেআইনি, আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং ফৌজদারি অপরাধ।
এ ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানায় সরকার।
সকল নাগরিকের প্রতি আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “মব সৃষ্টি করে উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী সকলকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

সোমবার সকালে গাজীপুরের মৌচাকে হর্টিকালচার সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, পুলিশের কেউ ওই ঘটনায় জড়িত থাকলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নুরুল হুদাকে যেভাবে বাসা থেকে ধরে আনা হয়েছে, সেটি ‘কোনোভাবেই কাম্য নয়’ বলে মন্তব্য করে উপদেষ্টা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটলে এবং বাহিনীর কেউ তাতে জড়িত থাকলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এছাড়া সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে হেনস্তা ও সংঘবদ্ধ হামলায় হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
কী বলছে বিএনপি
সাবেক সিইসি নুরুল হুদাকে বাসা থেকে ধরে এনে শারীরিকভাবে হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
সোমবার বিকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রিজভী বলেন, “সাবেক সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্যে যে আচরণ করা হয়েছে সেটি নিঃসন্দেহে গর্হিত কাজ। এ ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, তার বিচার দাবি করছে বিএনপি। যারা বিচারের নামে ‘মব জাস্টিস’ করছেন তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় দল হিসেবে বিএনপির ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবে সমর্থন করি না।”
‘‘দলীয়ভাবে আমাদের যে এখতিয়ার আছে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো, আর আইনিভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার থাকলে সেটা সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তারা দেখবেন।”
একাদশ সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সাবেক সিইসি কে এম নুরুল হুদাকে সোমবার বিকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে তোলা হয়।
কী বলছে পুলিশ
উত্তরা-পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “এই ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি, তবে হবে। যারা মব সৃষ্টি করেছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের একটা অংশ এটা করেছে। উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ফরিদের নেতৃত্বে এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। ফরিদের নামে ঘটনাস্থলে স্লোগানও হয়েছে।”
পুলিশের উপস্থিতিতে জুতাপেটা করা ব্যক্তি মোজাম্মেল ঢালী সেচ্ছাসেবক দলের কর্মী বলেও জানান তিনি।
পুলিশের সামনে ঘটনা ঘটলেও কেনো তা ঠেকানো হলো না- জানতে চাইলে ওসি হাফিজুর বলেন, “পুলিশ গিয়ে টেনে নিয়ে আসছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে আমাদের কাছে যখন কলটা আসে, তখন ওই এলাকায় দুইটা মোবাইল টিম ছিল, তাদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে ২৫০-৩০০ লোক ছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এতো মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ না করে ওনাকে ঠেলে নিয়ে এসে সেভ করছে। পুলিশ যখন ঢুকেছে ঘটনাস্থলে, তখন মাত্র জুতাপেটা শুরু হয়েছে। পরে পুলিশ ওনাদেরকে সরিয়ে স্যারকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে।”
‘মবের’ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কতোজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নেতা গোছের সবাই চিহ্নিত। গ্রেপ্তারের জন্য সবার নাম বলছি না। ওখানে অনেক লোক ঘটনা দেখতে আসছিলেন। মূলত ‘মব’করেছে ২০-২৫ জন। এরা সবাই চিহ্নিত। এরা সবাই ফরিদের ছেলেপেলে। আমরা অভিযান চালাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত তাদের আটক করতে পারবো।”