ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নারীকে আতঙ্কগ্রস্থ করার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলা হয়েছে ‘নারীর ডাকে মৈত্রীযাত্রা’ কর্মসূচি থেকে।
নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত এবং গুজব ও ধর্মীয় উসকানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি এই দাবি জানিয়েছে দেশের সকল পর্যায়ের নারী সমাজ।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’ কর্মসূচি থেকে পাঠ করা ঘোষণাপত্রে এই দাবি জানানো হয়। একজন মানবাধিকারকর্মী ও জুলাই শহীদ পরিবারের দুই সদস্য- মোট তিনজন এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, বিশেষত নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বুধবার দেশের প্রগতিশীল নারী, শ্রমিক, ছাত্র, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো শুক্রবারের (১৬ মে) এই কর্মসূচি ঘোষণা করে; যেখানে দেশের নারীদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মসূচি থেকে পাঠ করা ঘোষণাপত্রে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো-
# অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, বিশেষত: নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
# যারা আমাদের সমর্থন চায়- নির্বাচনী অঙ্গীকারের মাধ্যমে হোক বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোক- তাদের স্পষ্ট করতে হবে নারী, শ্রমিক, জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত ও লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং এসব জনগোষ্ঠীর পূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত মুক্তির বিষয়ে তাদের অবস্থান। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন থেকে তাদের প্রার্থীদের অন্তত শতকরা ৩৩ ভাগ (ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে) নারী হতে হবে।
# নারী ও প্রান্তিক জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারীর প্রতি সহিংসতার খবর আসে। নারীদের ফুটবল খেলা বন্ধ করার জন্য তৌহীদি জনতার ব্যানারে মব আক্রমণ, রিসোর্টে বেড়াতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জোর করে বিয়ে দেয়া, ধুমপান করাকে কেন্দ্র করে দুই শিক্ষার্থীর ওপর মব আক্রমণ, মুন্সিগঞ্জে দুই তরুণীকে লঞ্চে মারধরসহ নানা ঘটনা ঘটে।
অন্তব্র্তী সরকারের গঠন করা নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ সামনে আসার পর হেফজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন এর তীব্র বিরোধিতা করে। এছাড়া এর বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম সমাবেশও করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের করা এই কমিশন উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের সুপারিশ করেছে, সব ধর্মের মানুষদের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন করতে বলেছে, আবার যৌনকর্মীদের পেশাকে শ্রম আইনে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
হেফাজতের সমাবেশে এসব সুপারিশকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়েছে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে ‘যুদ্ধের’ ডাক দেয়া হবে।
একজন বক্তা নারী সংস্কার কমিশনকে ‘বেশ্যা কমিশন’ আখ্যা দেন। অন্য বক্তারাও কটূক্তি করেন।
নারীর প্রতি এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে শুক্রবার এই কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, “আমাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা আমরা মেনে নেবো না। আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোকে অস্বীকার করার ষড়যন্ত্র আমরা প্রতিরোধ করবো। বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে দমনমূলক অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা আমরা প্রতিরোধ করবো। ইতিহাসবিচ্ছিন্ন কূপমণ্ডুকতার মাধ্যমে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে আমরা কিছুতেই সফল হতে দেবো না।”
“আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস দারুণ বৈচিত্র্যময় এবং সংবেদনশীল। সেই বিশালতাকে উপেক্ষা করে আমরা গুটিকয়েক মানুষের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে সার্বজনীন হতে দেব না। আমরা অধিকার ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে দেব না, মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের দ্ব্যর্থকতা মেনে নেব না। আমরা সরকার ও প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নারী বিষয়ক অবস্থান নজরদারিতে রাখব। যে ক্ষমতাকাঠামো এসব জুলুমবাজি জিইয়ে রাখে, আমরা সেই কাঠামোকে ভাঙব।”
ঘোষণা পত্রে আরও বলা হয়, “চব্বিশের অভূতপূর্ব জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আজ আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমাদের দাবি, একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে সকল মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে বৈষম্যবিরোধিতা ও সাম্যের যৌথ মূল্যবোধের ওপর। সমতা ও ন্যায্যতার পথে এ মৈত্রীযাত্রায় আমরা সবাইকে স্বাগত জানাই।”
সেখানে বলা হয়,“আজ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও নিহতদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, শিল্পী, গার্মেন্টস শ্রমিক, চা-বাগানের শ্রমিক, যৌনকর্মী, প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী, হিজড়া, লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যময় ও অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ, তরুণী ও তরুণেরা, শিক্ষার্থী, আদিবাসী, অবাঙালি এবং আরো অনেকে। এ মানুষগুলোই আজকের বাংলাদেশের প্রতিনিধি; যারা সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, বৈচিত্রময়তা ও সহনশীলতার আকাঙ্খয় উজ্জীবিত।”
“কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এ অগ্রযাত্রায় নানান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। নারীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও তারা বাধা তৈরি করছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা, এবং অনলাইনে হয়রানি করে রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করার তৎপরতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত হামলা, আন্দোলনে বাধা, পরিকল্পিত মব-আক্রমণ, মোরাল পুলিশিং, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, প্রকাশ্যে মারধর, এবং নানান ধরণের হুমকি প্রদান অব্যাহত রয়েছে।”
নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের প্রতি অবমাননার বিষয় তুলে ধরে বলা হয় সরবকার এ বিষয়ে নিশ্চুপ।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, “…আমরা দেখেছি রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকেই অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সুপারিশগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গিয়ে এবং গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ না রেখে নানাধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। দেশবাসীর সামনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হচ্ছে। জনসম্মুখে কমিশনের সদস্যদেরকে জঘন্যভাবে অবমাননা করা হয়েছে।”
“এতোকিছুর মধ্যে আমরা দেখলাম, জুলাইয়ে অসংখ্য নারীর আত্মত্যাগ ও শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নারীর ওপর অব্যাহত নিপীড়ন, অবমাননা ও অপমানের বিরুদ্ধে আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ। সরকারের নিজের তৈরি করা নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্যদের ওপর এ ধরনের ন্যাক্কারজনক আক্রমণের পরেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
কর্মসূচিতে বলা হয়, “আমরা চুপ করবো না, হুমকির মুখে নত হবো না। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে অটল থাকবো। ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা হাল ছাড়বো না।”