মশিউর রহমান কাউসার, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ৮ ডিসেম্বর গৌরীপুুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী রাতের আধারে গৌরীপুর ছেড়ে চলে গেলে শত্রু মুক্ত হয় গৌরীপুর। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর এপ্রিলের প্রথম দিকে গৌরীপুরে শুরু হয় পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম পর্যায়ের সংগ্রাম। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও এমসিএ মরহুম হাতেম আলীর বাসভবনে এবং গৌরীপুর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আলী হাসানের তত্বাবধানে ১৭টি রাইফেল দিয়ে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। তাদেরকে সহযোগিতা করেন সেনাবাহিনীর ১জন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মো. মমতাজ উদ্দিন।
১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ থেকে রেলপথে পাক হানাদার বাহিনী গৌরীপুরে প্রবেশ করে। হানাদার বাহিনী গৌরীপুরে প্রবেশ করেই শুরু করে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। ঐ দিন সকাল থেকেই পাকিস্তানী জঙ্গি বিমান গৌরীপুরের আকাশে টহল দিয়ে থেমে থেমে আকাশ থেকে রেল ষ্টেশন, কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বর্পূ স্থাপনা লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে । হানাদার বাহিনী গৌরীপুর শহরে প্রবেশ করেই কালীপুর মোড়ে গুলি করে হত্যা করে স্কুল শিক্ষক ব্রজেন বিশ্বাসকে। ব্রজেন্দ্র বিশ্বাস গৌরীপুরে হানাদার বাহিনীর হাতে প্রথম শহীদ হলেও শহীদদের তালিকায় তার নাম উঠেনি। পাক হানাদার বাহিনী গৌরীপুর দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যায়। একে একে সবাই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিব বাড়ীতে আশ্রয় নেয় এবং ট্রেনিং নিতে শুরু করেন।
এদিকে গৌরীপুরে পাক হানাদার বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর চালায় নির্মম অত্যাচার। ১৬ মে সকালে পাক হানাদার বাহিনী শালীহর গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে যায় বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক মধু সুদন ধরকে এবং শহর থেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহাকে। তারা আজো ফিরে আসেনি। আগস্ট মাসে গৌরীপুরে অবস্থানরত পাক বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা। তারা হানাদারদের চলাফেরা ও যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেলসেতু এবং অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংস করে রেলষ্টেশন ও পাট গুদাম। মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলায় পাক বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং শালীহর গ্রামে প্রবেশ করে গণহত্যা শুরু করে। সেখানে ১৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং ধরে নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আবুল হাসেমের পিতা ছাবেদ হোসেনকে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ৩০ নভেম্বর পলাশ কান্দায় পাকহনাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন জসিম উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম মনজু ও মতিউর রহমান। শ্যামগঞ্জে শহীদ হন সুধীর বড়ুয়া।
অবশেষে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে গৌরীপুর শহর ছাড়া সমস্ত এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় পাক হানাদার বাহিনী ৭ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে শহর ছেড়ে রেলযোগে গৌরীপুর থেকে পালিয়ে যায়। ওইদিন রাতেই মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে আবুল কালাম আজাদ, আঃ হেকীম, নজরুল ইসলাম, সোহরাব, ছোট ফজলু, আনসার, কনুসহ একদল মুক্তিযোদ্ধার কাছে গৌরীপুর থানায় অবস্থানরত রাজাকাররা আত্মসমর্পন করে। এই খবর মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে শহরের মুক্তি পাগল মানুষ জয় বাংলা ধ্বনিতে গৌরীপুরের আকাশ মুখরিত করে তোলে এবং প্রাণঢালা অভিন্দন জানিয়ে বরণ করে নেয় বাংলার দুর্জয় সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের। স্বাধীনতার অংশ হিসেবে হানাদার মুক্ত হয় গৌরীপুর।
গৌরীপুরের মুক্তিযুদ্ধে যাদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম হাতেম আলী মিয়া (এমসিএ), মরহুম ডা. এম এ সোবহান, মরহুম মো. খালেদুজ্জামান, যুদ্ধকালীন ১১নং সাব-সেক্টর কমান্ডার মরহুম তোফাজ্জল হোসেন চন্নু ও মুজিব বাহিনীর কমান্ডার মরহুম মজিবুর রহমানের নাম অন্যতম। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।