শিরোনাম :
বন্ধ পাটকল চালু করলে অর্থনীতিতে গতি আসবে;বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যকর মাধ্যম: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সংশ্লিষ্টদের সেবকের ভূমিকা পালন করতে হবে: ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বাংলাদেশ-সেনেগাল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল ও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ বাংলাদেশ ইতালির সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উত্তর-পূর্ব জাপানে ভূমিকম্পে কাঁপন, তিন মিটার সুনামির আশঙ্কা লেবাননে ধর্মীয় প্রতীক ভাঙচুরের অভিযোগে উত্তেজনা, আইডিএফের তদন্ত শুরু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্যান্টন ফেয়ারের বাড়তি গুরুত্ব বৈশ্বিক চলচ্চিত্র সংযোগে বেইজিংয়ের অগ্রযাত্রা অনিশ্চিত বিশ্বে চীনের অর্থনীতি স্থিতির ভরসা

সকল বিচ্ছিন্নতা একটি সুতোয় গাঁথা

জার্মানবাংলা২৪ রিপোর্ট :
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৮

বিনয় দত্ত
১.
বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোন পর্যায়ে সবাইকে গ্রাস করে নেয় এই বোধটা মনে হয় আমরা হারিয়ে ফেলেছি, না হয় সকল পরিকল্পিত অপরিকল্পিত ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে চালিয়ে দেয়ার জোর প্রচেষ্টা আমাদের থাকতো না। কেন ঘটে এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা? আসেন একটু দৃশ্যমান থেকে নিরীক্ষের দৃষ্টি দিয়ে ভাববার চেষ্টা করি।

আমার বাবার দুই ছেলে। এক ছেলে ভয়ানক অসৎ, দুঃশ্চরিত্র, লম্পট প্রকৃতির। আরেক ছেলে ভদ্র, মার্জিত, সৎ প্রকৃতির। বাজারে, হাটে, ঘাটে, পাড়া পড়শির বাড়িতে সব জায়গায় বাবার অসৎ ছেলেটির কথা মুখে মুখে। যদি কেউ কোনো আড্ডার পরিসরে দশ ভাগ কথা বলেন, সেই দশ ভাগ কথার নয় ভাগ জুড়েই থাকে বাবার সেই অসৎ ছেলেটির বিভিন্ন কার্যকলাপ। আর এক ভাগ জুড়ে থাকে সৎ ছেলেটির কর্মকাণ্ড। বাবা নিজেও জানেন সেই অসৎ ছেলেটির কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে, কিন্তু ছেলেটি বাবার অনেক বেশি আদরের তাই বাবা বকা দিতে গিয়েও ইতস্তত বোধ করেন। এই ইতস্তত বোধই বাবার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আর অসৎ ছেলেটিকে বকা দেয়ার কোনো অবস্থানে নেই।

এই অসৎ ছেলেটি প্রথম দিকে ছোট-বড় ভুল করতো, ছোটখাট অপরাধ করতো, সল্প পরিসরে মানুষের ক্ষতি করতো তখন বাবা অসৎ ছেলেটিকে বকা দেননি বা শোধারানোর কোনো প্রক্রিয়াতে যাননি। তখন বাড়িতে অসৎ ছেলেটির নামে নালিশ আসলে বাবা সামান্য ঘটনা বলে ভুলে যেতে বলেছেন। এই সামান্য ঘটনাকে একটা সময় পরে বাবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। ফলে অসৎ ছেলেটি আস্তে আস্তে সাহস পেয়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটিয়েছে যা এখন ভয়ানক ভাবে সাধারণ মানুষকে পীড়া দিচ্ছে কিন্তু এখন বাবার আর কিছুই করার নেই কারণ অসৎ ছেলেটি বাবার সীমার বাইরে অনেক আগেই চলে গিয়েছে।

বাবার মৃত্যুর পরে অসৎ ছেলেটি সাধারণ মানুষের জন্য ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সবাই আড়ালে বাবাকে গালমন্দ করেন, মৃত বাবার নামে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন। মৃত বাবার আত্মার শান্তির জন্য যতই আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি না কেন, আমি জানি আমার মৃত বাবা কখনোই শান্তিতে থাকতে পারবেন না কারণ এতো মানুষের দুর্ভোগ, কষ্ট, যন্ত্রণার জন্য সবাই একতরফা আমার বাবাকে দোষারোপ করছেন। আমি জানি এই দোষারোপের বড় কারণ হচ্ছে বাবার অসৎ ছেলেটিকে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রশ্রয় দিতে দিতে বৃহৎ পরিসরে মুখ বুজে সহ্য করা।

এইরকম দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে। ঘর থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক দল সব ক্ষেত্রেই এই ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে। অভিভাবকের ভূমিকায় যিনি বা যারা আছেন তারা প্রিয় ছেলেটিকে শাসন না করে এতো বেশিমাত্রায় প্রশ্রয় দিয়েছেন যে অবাধ্য ছেলেটি এখন আর কোনোরূপ সীমার মধ্যে তো নেই-ই, বরং তাকে কিছু বলতে অভিভাবক নিজেই ইতস্তত বোধ করেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই অভিভাবকের সম্মান, তথা গোটা রাজনৈতিক দল বা আদর্শের সম্মান।

যেসব ছোট বড় পরিকল্পিত ঘটনাগুলো আমাদের সামনে ঘটছে সেইসব ঘটনাগুলোকে আমরা নিজেরাই নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য বিচ্ছিন্ন বলে ঘটনার মূল থেকে সরিয়ে দিচ্ছি তথা ঘটনার পিছনের পরিকল্পনাকারী এবং ঘটনার সাথে যুক্ত দুষ্কৃতিকারীদের আমরা নিজেরাই প্রশ্রয় দিয়ে লালিত পালিত করছি এতে করে সেই ঘটনার বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, ঘটনাই একসময় আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে।

২.
চট্টগ্রামের আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষগুলোর উপর হামলার বিচার, যশোরের সাঁথিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর হামলার বিচার, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের উপর হামলার বিচার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মিথ্যা উসকানীকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর হামলার বিচার, রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলার বিচার, শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার বিচার, রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিচার কি হয়েছে? এর দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি আমরা কি এখনো দেখেছি? দেখিনি। দেখবো কি না জানি না।

এইরকম প্রতিটি দৃশ্যমান ঘটনার পিছনে এমন একজন প্রিয় সন্তান লুকিয়ে আছে যে কখনো আড়াল থেকে বের হয়নি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আমরা সকলে দেখেছি, চিনেছি কিন্তু তার বা তাদের বিচার হয়নি। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সহিংসতার পিছনে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক দলের দুই প্রার্থীর কোন্দল স্পষ্ট। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পিছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা সারা পৃথিবী দেখেছে আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমের বদৌলতে কিন্তু তার বিচার এখনো হয়নি।
বরং প্রতিটি ঘটনার পর সক্রিয় প্রতিবাদকারী মহল যখন তার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেন তখন আমরা নিজেদের সভ্যতা, ভদ্রতা ভুলে বাজে মন্তব্য শুরু করি। পাশের দেশে কোন সম্প্রদায় কি অবস্থায় আছে তার সাথে তুলনা করি। পাশের দেশের তুলনায় আমাদের দেশের ভিকটিম বা ভুক্তভোগী সম্প্রদায়রা অনেক ভালো আছেন এই ধরনের মন্তব্য করি। এইটা কোন ধরনের মানবিকতা? এইটা কোনো সভ্য দেশের সাধারণ নাগরিকের ভাষা হতে পারে?

আমাদের দেশের যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো যেমন উচিত তেমনি সেইসব দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে তাদের শাস্তি দেয়ার পক্ষে যাওয়া উচিত। গুটিকয়েক মহল এবং কিছু প্রগতিশীল মানুষ এই কাজ করলেও বেশিরভাগ মানুষ বাজে মন্তব্য লিপ্ত থাকেন। এইটা কোনোভাবেই উচিত নয়। এতে নিজেদের ক্ষীণ মন মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে।

এই মানবিক বিপর্যয় দেখার জন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? এই দৃশ্যপট দেখার জন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল সম্প্রদায় ভুলে শ্লোগান দিয়েছিলাম, ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালী। বাঙালী।’ অথবা ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলিম, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, আমরা সবাই বাঙালী।’ এই শ্লোগানের মর্ম যদি আমরা আমাদের তরুণ সমাজকে অনুধাবন করাতে না পারি তবে এই শ্লোগানের সার্থকতা কোথায়?
৩.
সর্বশেষ রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের আটটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। প্রশাসন চাইলেই দ্রুত এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত বিক্ষোভকারীদের ধরে শাস্তি দিতে পারতো। এইরকম অনেক ঘটনাই ঘটে আবার তা সবাই ভুলেও যায়। এই ভুলে যাওয়াটা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইসব ছোট-বড় ঘটনা আমরা ভুলে যেতে যেতে একদিন বড় ঘটনার সামনে গিয়ে পড়বো তখন আমাদের মুক্তির কোনো পথ থাকবে না।

সম্প্রতি মিশরের আল-আরিশ নগরীর কাছে বির-আল আবেদ শহরের আল রাওদাহ মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাযের সময় এক হামলায় প্রায় তিনশোরও বেশি মুসল্লি নিহত হয়। এর মধ্যে কোমলমতি শিশুরাও ছিল। আমরা নিশ্চয় আমাদের দেশকে এইরকমভাবে দেখতে চায় না।

১লা জুলাই ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা হয়েছে। এই হামলায় বিশ্বের সকল দেশ আমাদের দুরবস্থা দেখেছে। এই হামলার পরিকল্পনা কিন্তু একদিনের নয়।

ছোট ছোট ভুল, ছোটখাট অসৎ কর্মকাণ্ডের প্রশ্রয়, বড় অপরাধের বিচার না হওয়া সহ সকল কিছু জড়ো হয়েই হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার জন্ম। এই জঙ্গি বাংলাদেশে একদিনে তৈরি হয়নি। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজের কর্ম পরিকল্পনা সাজিয়ে, নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে এই হামলা করেছে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ে যদি আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বেঁচে থাকার সাহস দিতে পারি তাহলে কেন সেই সাহস সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠী বা হিন্দু সম্প্রদায় বা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বা শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা পাবে না? ধর্ম দিয়ে মানুষ বিচার করার কোনো সুবিবেচকের কাজ নয়। মানুষের মনুষ্যত্ব দিয়ে মানুষকে বিচার করতে হয়। আমি আশা করি সকল বিচ্ছিন্ন ঘটনার অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নয় বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়াবে সবাই। শুধু বাইরে থেকে আগত মুসলিম রোহিঙ্গা নয়, আমাদের দেশের প্রতিটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানধর্মাবলম্বী মানুষের বিপদে আপদে আমরাই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়বো।

বিনয় দত্ত
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD