বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামী নেতা এটিএম আজাহারকে কারামুক্তির পর দলীয় সংবর্ধনাকে ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের প্রতিধ্বনি’ বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।
শুক্রবার (৩০ মে) এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চল ও সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার এই মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রিভিউ শুনানিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও আল-বদর বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে; যাকে ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদÐাদেশ দিয়েছিলেন।
আপিল বিভাগের সর্বশেষ এই রায়ের (রিভিউ শুনানিতে বেকসুর খালাস) মাধ্যমে ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়কে অস্বীকার করার একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপিত হলো বলে ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, রায়ের পরদিনই রাজধানী ঢাকার শাহবাগে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা তাকে আজাহারকে ফুল দিয়ে বরণ করে নায়কসুলভ প্রত্যাবর্তন উপহার দিয়েছে। এই ঘটনাটি কেবল যুদ্ধাপরাধকে অস্বীকার করার প্রচেষ্টাই নয় বরং এটি সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের উত্থানের জোরালো ইঙ্গিত দেয়। শাহবাগ; যেখানে একসময় ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের’ বিচারের দাবি উঠেছিল, সেখানেই আজ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের প্রতিধ্বনি শোনা গেলো।
ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ বলেন, এই রায় শুধু বিচারিক দায়বদ্ধতার চরম ব্যর্থতা নয়, বরং এটি ন্যায়বিচারের নামে নিষ্ঠুর প্রহসন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের সঙ্গে এই রায় সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ধ্বংস করার সমান। বিচার ব্যবস্থা যখন রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতদুষ্টতার কাছে নতজানু হয়ে পড়ে, তখন তা ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করে।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, যদিও এটিএম আজহার গণহত্যার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন, তবে ইতিহাস তাকে এবং জামায়াতে ইসলামীকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। নানান নথিপত্র ও গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, ১৯৭১ সালে এটিএম আজহার জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’র রংপুর কারমাইকেল কলেজ শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংগঠনটি সরাসরি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এবং হত্যা ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিল। কাজেই, সাংগঠনিক যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে আজহার কোনোভাবেই নিষ্কৃতি পাবেন না।
নেতৃবৃন্দ যোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের ওপর জনগণ অর্পিত নৈতিক দায়িত্ব ছিল, আওয়ামীলীগ আমলে সংঘটিত গণহত্যার একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এটিএম আজহারকে খালাস দেয়া একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ, যা আদালতের নিরপেক্ষতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ছাত্র ইউনিয়নের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এই মামলায় বর্তমান প্রসিকিউশন টিমের ভূমিকা অত্যন্ত সন্দেহজনক। যেখানে প্রধান প্রসিকিউটরসহ একাধিক সদস্য অতীতে যুদ্ধাপরাধের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন, সেখানে ‘স্বার্থের সংঘাত’ (ঈড়হভষরপঃ ড়ভ ওহঃবৎবংঃ) বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া শুধু অনৈতিক নয়, এটি পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই কলুষিত করেছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যখন পূর্ববর্তী প্রসিকিউশন টিমের ব্যর্থতার দায় নিতে অস্বীকার করেন, তখন তা পেশাগত দায়িত্ববোধের চরম অবক্ষয়ই নয়, বরং এটি বিচারিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল ও অকার্যকর করে তোলে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থার আকাঙ্খা তৈরি করেছিল, এই রায় সেই আকাঙ্খার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। ইতোমধ্যে জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে জনমনে যে গভীর শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, এই রায় সেই শঙ্কাকে আরো ঘনীভুত করেছে।
বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় আরো বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বর্বর হামলায় বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ মে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে গেলে তথাকথিত ‘শাহবাগবিরোধী ঐক্য’ ব্যানারের আড়ালে জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে নৃশংস হামলা চালায়। চট্টগ্রামের এই হামলায় ১২ জন শিক্ষার্থী আহত হন; যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার সময় নারী কর্মীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করা হয়েছে, পুরুষ নেতা-কর্মীদের ওপর চলে দফায় দফায় মারধর। এছাড়াও ২৯ মে মৌলভীবাজারে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্রফ্রন্টের এক নেতাকে হেনস্তা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের কর্মসূচি চলাকালে ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি ভেঙে দিয়ে ছাত্র শিবির বারবার উসকানিমূলক তৎপরতা চালিয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, এখন জামায়াত-শিবির তাদের পুরোনো কৌশলে ফিরে গেছে- ধর্মীয় উগ্রতা, নারী-বিদ্বেষ, সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীলদের উপর হামলা, অনলাইনে ‘নাস্তিক’, ‘শাহবাগী’ ট্যাগ দিয়ে চরিত্র হনন এবং বট-মবভিত্তিক আক্রমণের মাধ্যমে গণ-আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের প্রান্তিকীকরণ করার চেষ্টা চলছে। সারাদেশে তারা পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস কায়েম করে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করছে। একাত্তরের চেতনায় গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খাকে পদদলিত করে তারা একটি বহুত্ববাদবিরোধী, নারীবিদ্বেষী, ধর্মীয় একনায়কত্ব কায়েমে লিপ্ত হয়েছে। জামায়াত-শিবির এখন আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে নতুন করে সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন দৃঢ়ভাবে দেশের ছাত্র সমাজকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াত-শিবিরের এই নতুন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রাজপথেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিদায় ঘণ্টা বাজাবে।