নির্বাচন ফেব্রুয়ারি না এপ্রিলে- এটি মুখ্য বিষয় নয়, প্রতিক্রিয়ায় নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী
বাংলাদেশে একটি দলকে খুশি করতে সে দেশে নির্বাচন এগিয়ে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।
লন্ডন সফররত বাংলাদেশের অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশের সাবেক শাসক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বৈঠকে নির্বাচন এগিয়ে আনার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপি নেতা তাৎক্ষণিক এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেড়ঘণ্টা বৈঠক হয়।
বৈঠক শেষে দু’পক্ষের যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, এপ্রিলের বদলে জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে এনে সব প্রস্তুতি শেষ হলে আগামী রোজার আগে ভোট আয়োজন করা হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেন।
এ সময় তিনি বলেন, “যখন সরকার একটি দলের হয়ে কাজ করে, তখন সেটা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। সরকারের লেজিটিমেসি আসে ১৮ কোটি মানুষের কাছ থেকে, একটি দলের কাছ থেকে নয়। তাই এই রাজনৈতিক হিপোক্রিসি (ভন্ডামি) দেশের জন্য ভয়ানক হবে।”
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-গণআন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের শাসনের অবসানের প্রায় সাত মাসের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় এনিসিপি।
নতুন দলের নেতৃত্বে রয়েছেন ৫ আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া প্রথম সারির ছাত্রনেতারা। যার মধ্যে অন্যতম হলেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম; যিনি বর্তমান সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা।
এনসিপির শীর্ষ নেতা নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, “লন্ডনে আজ যে মিটিংটি হয়েছে, এতে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং একটি পুরাতন বন্দোবস্তের দিকেই বাংলাদেশকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। নতুন কোনো ব্যবস্থা বা কাঠামোর ইঙ্গিত আমরা ওই মিটিংয়ে দেখতে পাইনি।”
তিনি আরো বলেন, “খুনি হাসিনা একদিকে বার্তা দিচ্ছে, আরেকদিকে একটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতা লন্ডনে বসে মিটিং করছেন ও বার্তা দিচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে, এই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের মাটি ও প্রকৃতির কোনো সংযোগ নেই।”
আওয়ামী লীগ সরকার পতনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের দল এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আরো বলেন, “দেশের সিদ্ধান্ত দেশের মাটিতেই হবে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত হলে সেটি জনগণ মেনে নেবে না। সরকারকে আহ্বান জানাবো, দেশের জনগণের সঙ্গে কথা বলুন। গ্রামে-গঞ্জে যান, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের সঙ্গে বসুন। তাদের আশা-আকাঙ্খা আর বেদনা বুঝতে পারলে আপনারা জুলাই সনদ, বিচার ও সংস্কার বিষয়ে উদ্যোগী হতে পারবেন।”
নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, “জুলাই ঘোষণাপত্র, বিচার প্রক্রিয়া, মৌলিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন— এই বিষয়গুলো সম্পন্ন না হলে আমরা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবো না। বরং তাহলে হয়তো আমরা আবারো একটি গণঅভ্যুত্থানের দিকেই যাবো।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যদি কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন না হয়, শুধু রাজার পরিবর্তে রাজা বা রানীর পরিবর্তে রানী হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনে এনসিপি বিশ্বাস করে না। অভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ থেকে যেহেতু আমাদের জন্ম, সেহেতু জনগণের প্রতি আমাদের কিছু কমিটমেন্ট আছে। সেই জনগণকে বলবো— যে আশায় আপনারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছেন, সে আশা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রামে এনসিপি আপনাদের পাশে থাকবে।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাসীরুদ্দীন বলেন, “আমরা চাই, বাংলাদেশের দ্রুত গণতান্ত্রিক যাত্রার উত্তরণ ঘটুক। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলো নাকি এপ্রিলে—এটি মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য হলো— জুলাই সনদ, বিচার ও সংস্কার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলের কালো আইন বাতিল করে নতুন একটি ব্যবস্থার সূচনা।”
তিনি আরো বলেন, “এই যাত্রা যদি শেখ হাসিনার আমলের ধারাবাহিকতাতেই যায়, তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য গভীর সংকট। আমরা তা হতে দেব না।”
নাসীরুদ্দীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “সরকার লন্ডনে একটি দলের সঙ্গে বসে যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অশনি সংকেত। সরকার এই আলোচনা দেশে বসেই করতে পারতো। তাহলে আমরা একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারতাম।”